Alexa অলৌকিকভাবে পাকিস্তানের বিশ্বকাপ জয়

ঢাকা, বৃহস্পতিবার   ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯,   আশ্বিন ৪ ১৪২৬,   ১৯ মুহররম ১৪৪১

Akash

পঞ্চম বিশ্বকাপ -১৯৯২

অলৌকিকভাবে পাকিস্তানের বিশ্বকাপ জয়

রুশাদ রাসেল  ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ২২:৪৪ ২৩ মে ২০১৯   আপডেট: ২২:৪৫ ২৩ মে ২০১৯

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

আগের বিশ্বকাপে সেমিফাইনাল, এই বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন। অনেকে শুধু ফলাফল দেখেই ধরে নিবেন পাকিস্তান বোধহয় ফেবারিট হিসেবেই বিশ্বকাপ জিতেছে। কিন্তু ভঙ্গুর একটি দলও যে কীভাবে বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হতে পারে তারই নজির সৃষ্টি হয় অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ডে। দলীয় কোন্দল, খেলোয়াড়দের মাঝে সমন্বয়হীনতা সবকিছু মিলিয়ে আত্মবিশ্বাস একদমই তলানিতে ছিল তখনকার পাকিস্তান দলে। কিন্তু সেই দলটিকেই যেন আলাদীনের চেরাগ দিয়ে উজ্জ্বীবিত করেন ইমরান খান। তার বিশ্বকাপ জয়টা কম অলৌকিক ব্যাপার না। 

১৯৮৭ সালেই ক্রিকেটকে বিদায় জানান ক্রিকেটের অন্যতম সেরা এই অলরাউন্ডার। অবসরের পর ইমরানকে আবারো দলে ফেরার জন্য জেনারেল জিয়া-উল-হক অনুরোধ করেন। এর মাঝে বাবা চালা নামে একজন ধর্মীয় যাজকের সঙ্গে পরিচয় ঘটে ইমরানের এবং তিনি তার দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন। এ লোকটি জানতো না ইমরান কে, কি তার পরিচয়। সে কেবল বলেছিল ইমরান যা করেছে, সেটিই তার শেষ নয়। এটাই ইমরানকে বদলে দেয়। আকর্ষণীয় ইমরান থেকে সুফি ইমরানে নিয়ে যায়। ইমরান পরিণত হন ইসলাম অনুসরণকারী, স্বাধীনচেতা একজন মানুষে। সেই ইমরানের হাত ধরেই বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হয় পাকিস্তান।

 ইংল্যান্ড, এশিয়া ঘুরে পঞ্চম বিশ্বকাপের আসর বসে অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডে। যৌথভাবে আয়োজনের দ্বিতীয় নজির। বিশ্বকাপের ইতিহাস বলে ৪ বছর অন্তর অন্তর হচ্ছিল বিশ্বকাপ। কিন্তু ৪ বছর পর ১৯৯১ সালে বিশ্বকাপ হওয়ার কথা থাকলেও সেই বিশ্বকাপ আয়োজিত হয় ১৯৯২ সালে। কেন বিশ্বকাপ দেরিতে আয়োজন করা হয়েছিল এ নিয়ে মানুষের ভেতর আজও কৌতুহলের শেষ নেই। ’৮৭ বিশ্বকাপ নভেম্বর মাসে শেষ হয়। তখনই ঠিক করা হয় মূলত ১৯৯১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে হবে বিশ্বকাপ। বিপত্তি ঘটে অন্য জায়গায়। 

অস্ট্রেলিয়া ১৯৯১ সালের ফেব্রুয়ারিতে এশেজ সিরিজ আয়োজন করে। অস্ট্রেলিয়ানদের কাছে এশেজের থেকে বড় কিছু নেই ক্রিকেটে। এটা তাদের মর্যাদার লড়াই। এখানে কাউকে কোন প্রকার ছাড় দিতে নারাজ। এজন্য বিশ্বকাপ পিছিয়ে আয়োজন করার কথা বলা হয় নভেম্বরে। কিন্তু তখন অস্ট্রেলিয়ায় বর্ষাকাল চলে। অন্যদিকে, নভেম্বরের শেষ থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়ায় গ্রীষ্মকাল। মার্চ মাস তাদের সবচেয়ে উষ্ণতম মাস। তাই সব মিলিয়ে বিশ্বকাপ ১৯৯২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। কিন্তু তবুও বৃষ্টির মরণ থাবা কেড়ে নেয় বিশ্বকাপের অনেকগুলো ম্যাচ। ১০টি ম্যাচে হানা দেয় বৃষ্টি। যা এখন পর্যন্ত বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি ম্যাচে বৃষ্টি হানা দেওয়ার রেকর্ড। 

এবারের বিশ্বকাপে প্রথমবারের মত ফরম্যাট চ্যাঞ্জ করে ফেলে আয়োজক কমিটি। আগে যেমন চার দল দুটি গ্রুপে বিভক্ত হয়ে লড়াই করতো, শীর্ষ দুই দল সেমিফাইনাল খেলত, এবার সেরকম নয়। আগের বিশ্বকাপের ৮ দলই অংশ নেয় ’৯২ বিশ্বকাপে। তবে এবার প্রথমবারের মত দীর্ঘদিন নির্বাসিত থাকার পর বিশ্বকাপে খেলার সুযোগ পায় দক্ষিন আফ্রিকা। কিন্তু এবার আট দলের প্রত্যেকে প্রত্যেকের সঙ্গে খেলার সুযোগ পায়। যাকে বলে রাউন্ড রবিন লিগ পদ্ধতি। যেখানে আট দলের শীর্ষ ৪ দল চলে যায় সেমিফাইনালে।

 তবে এই বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো রঙিন পোশাকে খেলার প্রচলণ শুরু হয়। এই বিশ্বকাপে প্রথমবারের মত কোন ক্রিকেট ম্যাচ দিবারাত্রির আয়োজন করা হয়। তাছাড়া টিভিতেও দেখানো হয় বিশ্বকাপের সবগুলো ম্যাচ। 

শিরোনামেই লেখা হয়েছে পাকিস্তানের বিশ্বকাপ জয়টা ছিল পুরোটাই অলৌকিক। পুরো টুর্নামেন্টের দিকে ভালোভাবে নজর দিলে আদতে সেটিই মনে হবে। অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে পাকিস্তান যখন নিজেদের ষষ্ঠ ম্যাচে মাঠে নামতে যাচ্ছে তখন পাকিস্তানের ঝুলিতে ৫ ম্যাচে মাত্র ১ জয়। কেউ কী তখন ভেবেছিল এই পাকিস্তানই পরবর্তীতে চ্যাম্পিয়ন হবে? দলটির অবস্থা ছিল দলীয় কোন্দলে শয্যাশায়ীর মত। ওয়াসিম আকরাম তখন বলেছিলেন, দলটির ভেতর অনেক সমস্যা চলছে। 

অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ম্যাচের আগে দলের সবাইকে ডাকলেন, সেখানে সবাইকে ইমরান খান বললেন, এখনো তাদের সুযোগ রয়েছে পরের রাউন্ডে যাওয়ার। দলের সবাই তখন ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেল। ইমরান মিটিং থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পরেও তারা বুঝতে পারছিল না আসলে কী বললো সে! 

খেলোয়াড়দের সেইদিন ড্রেসিং রুমে ইমরানের সেই প্রেরণাদায়ক বাণীই আসলে পাকিস্তানকে বিশ্বকাপ জিততে সাহায্য করেছিল। ইমরান সেদিন বলেন ‘তুমি, তোমার থেকে কি সেরা খেলোয়াড় রয়েছে? তুমি, তোমার থেকে কি সেরা ফিল্ডার রয়েছে? তুমি, তোমার থেকে কি সেরা ব্যাটসম্যান রয়েছে? তুমি, তোমার থেকে কি সেরা বোলার রয়েছে?’ টানা বিশ মিনিট ইমরানের এই কথা সবাই মনযোগ দিয়ে শুনেন। সবার মাথার উপর দিয়ে যায় ইমরানের এই বাণীগুলো। পরে এসেছিলেন সাদা রঙের একটি টি-শার্ট। যেটির বুকে আঁকা ছিল, বাঘের ছবি। যেটিকে বলা হয় ‘পাঠান টাইগার’। এমন রূপকথারও জন্ম দেয়া যায়!

প্রথম ম্যাচেই পাকিস্তান ওয়েস্ট ইন্ডিজের কাছে পরাজয় বরণ করে নেয়। এরপর ছোট দল জিম্বাবুয়েকে হারালেও পরের ম্যাচে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে মাত্র ৭৪ রানে অলআউট হয় পাকিস্তান। কিন্তু আশ্চর্য হলেও সত্যি ঐ ম্যাচ থেকেই পাকিস্তান পেয়েছিল এক পয়েন্ট। ইংল্যান্ডের যখন ২৪ রান, তখন বৃষ্টি নামলে আর খেলা মাঠে গড়ায় নি। ওই পয়েন্টটাই যেন আশীর্বাদ হয়ে আসে তাদের জন্য। ঐ এক পয়েন্টের সুবাদেই অস্ট্রেলিয়াকে টপকে সেমিফাইনালে খেলার সুযোগ করে নেয় ইমরান খানের দল। ঐ ম্যাচের পরের দুই ম্যাচে ভারত ও দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে টানা হারে পাকিস্তানের সেমির আশা অনেকটাই ধোঁয়াশা হতে লাগে। কিন্তু বাঁচা-মরার ম্যাচে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে জ্বলে ওঠে পাকিস্তান। আকিব জাভেদের ব্যাট হাতে ৭৬ রান ও বল হাতে ২১ রানে ৩ উইকেটই পাকিস্তানকে অকল্পনীয় এক জয় এনে দেয় স্বাগতিক দেশের বিরুদ্ধে।  

পরের ম্যাচে শ্রীলংকার বিপক্ষে ২১৩ রান টপকে সহজেই জয়লাভ করে পাকিস্তান। তখনও তেমন পরাশক্তি হয়ে উঠতে পারেনি লংকানরা। এরপরের ম্যাচে পাকিস্তান মুখোমুখি হয় তখনও পর্যন্ত বিশ্বকাপে অপরাজিত নিউজিল্যান্ডের। ক্রাইসচার্চে হওয়া এই ম্যাচে ওয়াসিম আকরামের বোলিং নৈপুণ্যে মাত্র ১৬৬ রানেই অলআউট হয় তারা। আকরাম নেন ৪ উইকেট। রমিজ রাজার সেঞ্চুরিতে ৫ ওভার বাকি থাকতে অনায়াসে জয় পায় পাকিস্তান।  

কিউইদের বিপক্ষে জয়ের পরেও পাকিস্তানের ভাগ্য নিজেদের হাতে ছিল না। অসংখ্য সমীকরনের মারপ্যাচে আটকে ছিল পাকিস্তানের সেমিতে ওঠার সম্ভাবনা। কেননা, শেষ ম্যাচে অস্ট্রেলিয়ার হারাতে হবে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে। কাকতালীয়ভাবে কিউইদের হারানোর দিনেই ওয়েস্ট ইন্ডিজকে হারিয়ে দেয় অস্ট্রেলিয়া। আর অলৌকিকভাবে সেমিতে উঠে যায় পাকিস্তান। 

আগের বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হয়েও এই বিশ্বকাপে মাত্র ২টি ম্যাচে জয়ের দেখা পায় ভারত। বিদায় নেয় ষষ্ঠ হয়ে। ইংল্যান্ড, নিউজল্যান্ডের সঙ্গে দক্ষিণ আফ্রিকাও জায়গায় করে নেয় বিশ্বকাপের সেমিতে। 

সেমিতে স্বাগতিক নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে পাকিস্তানের লড়াইটা অনেকে ভেবেছিল এক পেশে হবে। অকল্যান্ডে হওয়া ম্যাচে প্রথমে ব্যাট করতে নেমে মার্টিন ক্রোর ৯১ রানের সুবাদে ২৬২ রানের লড়াকু সংগ্রহ পায় নিউজিল্যান্ড। খুব স্বাভাবিকভাবে স্বাচ্ছন্দ্যে ড্রেসিং রুমে সময় কাটাচ্ছিল তারা। তারা জানতো, পাকিস্তানের অন্তত এত রান তারা করে জেতার সামর্থ্য নেই, বিশ্বকাপের পারফরম্যান্স সেটাই বলে। কিন্তু ঐ দিনটি ছিল পাকিস্তানের, ঐ দিনটি ছিল তরুণ ক্রিকেটার ইনজামাম উল হকের। ইনজির ৩৭ বলে ৬০ রানই পাকিস্তানকে ১ ওভার বাকি থাকতে জয়ের বন্দরে পৌঁছে দেয়।  অন্য সেমিফাইনালে দক্ষিণ আফ্রিকাকে ২০ রানে হারিয়ে তৃতীয়বারের মত ফাইনালে ওঠে  যায় ইংল্যান্ড। 
এমসিজিতে ৮৭ হাজার দর্শক উপস্থিত ছিলেন পাকিস্তান বনাম ইংল্যান্ডের ফাইনাল ম্যাচ দেখার জন্য। ইমরান খানের ক্যারিশমেটিক অধিনায়কত্বই মূলত ঐ ফাইনাল জিততে পাকিস্তানকে সহায়তা করে। ব্যাট হাতে ১১০ বলে ৭২ রান করে পাকিস্তানকে ২৪৯ রানের একটি লড়াকু সংগ্রহ এনে দেন ইমরান খান। কিন্তু ইংল্যান্ডের ঐ ব্যাটিং লাইন আপের কাছে এটি তেমন সমস্যার ছিল না। তবে সবকিছুকে যেন নিমিষেই পালটে দিলেন ওয়াসিম আকরাম। ইয়ান বোথামকে শূন্য রানে ফেরান এই পেসার। 

এক পর্যায়ে ৬৯ রানেই ৪ উইকেট হারিয়ে বসে ইংল্যান্ড। কিন্তু এলান লাম্ব ও নেইল ফেয়ার ব্রাদার ইংলিশদের হাল ধরেন। ৭১ রানের জুটি গড়ে দলকে বিপর্যয় থেকে টেনে তোলেন। ৩৫ তম ওভারে আবারও আকরামকে বোলিংয়ে আনেন ইমরান। মূলত এই সিদ্ধান্তই পাকিস্তানের বিশ্বকাপ জয়ের বীজ বপন করে দেয়। এলান লাম্ব ও ক্রিস লুইসকে এক ওভারে ফিরিয়ে আবারও ম্যাচের নাটাই নিজেদের হাতে নিয়ে নেন ওয়াসিম। এরপর শুধুই পাকিস্তান রূপকথা। চার বল বাকি থাকতে ২২৭ রানেই অলআউট হয়ে যায় ইংল্যান্ড। পাকিস্তান পায়  ২২ রানের অবিস্মরণীয় এক জয়।  

বিশ্বকাপের কিছু মজার তথ্যঃ 
# বিশ্বকাপে প্রথমবারের মত খেলার সুযোগ পায় দক্ষিণ আফ্রিকা।
# এই বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো দুটি নতুন বল দিয়ে খেলার নিয়ম চালু করা হয়। 
# ম্যাচের প্রথম ১৫ ওভারের ভেতর ৫ জন ফিল্ডার থাকবে সার্কেলের ভেতরে।  
# ৩১৩/৭, বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ দলীয় সংগ্রহ ছিল শ্রীলংকার  প্রতিপক্ষ ছিল জিম্বাবুয়ে। 
# ৪৫৬ , টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ রান করেন নিউজিল্যান্ডের মার্টিন ক্রো। 
# ১১৯* টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত স্কোরটি ছিল রমিজ রাজার। 
# ১৭৫* টুর্নামেন্টে সর্বোচ্চ ১৭৫ রানের জুটি গড়েন ডেসমন্ড হেইন্স ও ব্রায়ান লারা। 
# টুর্নামেন্ট সর্বোচ্চ ১৮ উইকেট নেন ওয়াসিম আকরাম। 
# ৪/১১, টুর্নামেন্টের সেরা ব্যক্তিগত বোলিং ফিগারটি ছিল দক্ষিণ আফ্রিকার মেয়রিক প্রিঙ্গেলের।

ডেইলি বাংলাদেশ/সালি