অর্থনৈতিক মুক্তির প্রয়োজনেই নারী উন্নয়ন জরুরি

ঢাকা, বুধবার   ২৬ জুন ২০১৯,   আষাঢ় ১২ ১৪২৬,   ২১ শাওয়াল ১৪৪০

অর্থনৈতিক মুক্তির প্রয়োজনেই নারী উন্নয়ন জরুরি

 প্রকাশিত: ১৭:২৫ ৩১ মার্চ ২০১৯   আপডেট: ১৭:২৫ ৩১ মার্চ ২০১৯

নাট্যকার ও কথাসাহিত্যিক রুমা মোদক। জন্ম  হবিগঞ্জে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে এম.এ।এ পর্যন্ত প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা সাত। তিনি ওতোপ্রোতো কাজ করছেন মঞ্চে।  ই-মেইল: [email protected]

নানা প্রতিবন্ধকতার মধ্য দিয়ে নারী এগিয়ে যাচ্ছে। এই এগিয়ে যাওয়া যেমন আনন্দের তেমনি এগোনের পেছনে অনেক দুঃখজনক ঘটনাও থাকে। এই যেমন সেদিনও একটি ঘটনা প্রত্যক্ষ করলাম।

এক নারী পিরিয়ডকালীন পাঁচদিন ছুটি দাবি করলে কর্তৃপক্ষ যুক্তি দেখিয়ে বলছে, ‘এই ছুটি নারীদের কর্মক্ষেত্রে পিছিয়ে দেবে।’ বিষয়টি আমার হৃদয়ে বিঁধলো। যে প্রতিষ্ঠান থেকে এমন যুক্তি দেখানো হলো ওই প্রতিষ্ঠানে কিন্তু অনেক শিক্ষিত, সচেতন মানুষ আছে। গোড়া সমাজ থেকে যখন নারীর প্রতি অবজ্ঞামূলক মন্তব্য বা সিদ্ধান্ত আসে তখন খারাপ লাগে। কষ্ট পাই। তবে ততটা মর্মাহত হই না। কারণ ওরা তো না বুঝেই এসব করে। ওদের প্রতি করুণা ছাড়া কিছুই করার থাকে না। কিন্তু যখন সচেতন মহল এমন করেন তখন মর্মাহত হই। প্রায়ই পুরুষ সহকর্মীদের ঠাট্টা করে বলতে শুনি, আজ বাচ্চার জ্বর কাল বাচ্চার পেটের অসুখ বলে নারী সহকর্মীরা কেবল ছুটি নেয়ার ধান্ধায় থাকে। তাদের একজনকে আমি প্রশ্ন করেছিলাম আসলেই কী বাচ্চা অসুস্থ থাকে নাকি বাচ্চার অসুস্থতার অজুহাতে সে ফাঁকি দিতে চায়? তিনি সততার সঙ্গেই জানান, না বাচ্চা ঠিকই অসুস্থ থাকে। তিনি এও যোগ করেন, এজন্যই নারীদের এতো চাকরি দিতে নেই।

মানসিক দীনতার জায়গাটুকু দেখুন। নারীদের চাকরি দেয় নাকি নারীরা নিজ যোগ্যতায় চাকরি পায়? যে নারী একশো বছর আগে ঘর ছেড়ে বাইরে আসতো না আজ দলে দলে বাইরে আসছে অর্থনৈতিক প্রয়োজনে। আমাদের অর্থনৈতিক মুক্তির প্রয়োজনেই নারী উন্নয়ন দরকার। একসময় একজন পুরুষের রোজগারে যখন পরিবারের খরচ নির্বাহ করা যেতো সময়ের প্রয়োজনে আজ তাতে যুক্ত হতে হয়েছে নারীকেও। কিন্তু আমাদের সামাজিক ও পারিবারিক মূল্যবোধ কী নারীকে সামন্ত সমাজ কর্তৃক অর্পিত দায়িত্বে সামান্য ছাড় দিয়েছে? সন্তান পালন থেকে গৃহস্থালী? শিক্ষিত হওয়ার ফলে তাদের উপর অর্পিত হয়েছে আরো কিছু মানবিক ও বিবেচনাবোধ। ফলে একজন নারীর এখন বহুমুখী দায়িত্ব। পেশাগত, পারিবারিক, মানবিক এবং অর্থনৈতিক দায়িত্ব এখন নারীরাও সমানভাবে পালন করে। সেই তুলনায় পুরুষকে দেখুন। সামন্ত সমাজের তুলনায় কী পরিবর্তন ঘটেছে তার দায়িত্ব এবং কর্তব্যে?  লেখক হিসাবে কিংবা নাট্যকর্মী হিসাবে আমার পরিচয়ের আগে যখন ‘নারী’ শব্দটি যুক্ত হয়, তখন তা নিরংকুশভাবে অস্বীকার বা স্বীকার কোনটিই করার উপায় থাকে না। মূল্যায়নের ক্ষেত্রে আমার সৃজন প্রতিভা কিংবা কর্মদক্ষতাকে কেবল ‘নারী’ হিসাবে মূল্যায়নের প্রক্রিয়াটি অসম্মানজনক এই কারণে যে, এতে প্রবণতাটাই থাকে নারীদের অবমূল্যায়ন করার। অর্থাৎ নারীর মেধা কেবলই নারীর সাথে তুলনীয়। তা কোনোভাবেই পুরুষের সমকক্ষ নয়। কী বিজ্ঞান, কী কাল, কী অভিজ্ঞতা, ইতিহাস সবকিছুই সাক্ষ্য দেয় মেধা যোগ্যতা সৃজনশীলতার কোন লিঙ্গভেদ হয় না। 

কিন্তু লৈঙ্গিক পরিচয়ে আমি যে নারী তা অস্বীকার করার বিষয় নয়। প্রাণীজগতে প্রতিটি প্রাণীর দুইটি প্রজাতী নারী এবং পুরুষ। সৃষ্টির ধারাবাহিকতা রক্ষার স্বার্থে এটি প্রকৃতি নির্ধারিত নিয়ম। এই লিঙ্গ পরিচয়ে জন্মের ক্ষেত্রে প্রকৃতি ভিন্ন অন্য কোনো নিয়ামক নেই। প্রকৃতিতে প্রানীক‚লের যে কোন প্রাণীর নারী কিংবা পুরুষ উভয়ের দৈহিক গঠন, দায়িত্ব ও প্রকৃতি নির্ধারিত। একমাত্র মানব প্রজাতি ছাড়া কোথাও বৈষম্যের প্রশ্ন নেই। নারী বলে প্রণী জগতের কোথাও বিশেষ লিঙ্গের প্রতি অবহেলা কিংবা অবজ্ঞার কোন বিষয় কিংবা বোধই নেই।        

মানব প্রজাতির মধ্যে কেনো এই বৈষম্য, তাকি প্রকৃতিপ্রদত্ত? অবশ্যম্ভাবী? এর কোনটিই নয়। শাস্ত্র কিংবা মিথ কিংবা দেশাচার যে যাই বলুক পৃথিবীর যে কোনো প্রান্তে মানবসভ্যতায় নারীকে অবদমনের জন্ম মানুষের মস্তিস্কে। তা সে এই উপমহাদেশে হোক কিংবা অন্যত্র। মানুষ সভ্য হয়েছে, সভ্যতা সৃষ্টি করেছে তার সমাজ ব্যবস্থ। এই ব্যবস্থা সময়ের প্রয়োজনে নিয়ন্ত্রিত হয়েছে অর্থনৈতিক কাঠামো দ্বারা আর পর্যায়ক্রমে নারী বন্দী হয়েছে নির্যাতিত হয়েছে শৃঙ্খলিত হয়েছে। আদিম কৃষিজীবী সমাজ থেকে এই শিল্পোন্নত সমাজে উন্নত হবার ধাপে ধাপে নারীর ক্রমাগত বন্দী হবার ইতিহাস সবার কমবেশি জানা। 

মূলত সন্তান ধারণের প্রকৃতিপ্রদত্ত যে জৈবিক ক্ষমতা, যার কারণে টিকে আছে মানব জাতির অস্তিত্ব, যার জন্য নারী প্রাপ্য হয় অধিক সম্মান ও মর্যাদার। আমাদের সভ্য সমাজ শুধু এই শারিরীক অক্ষমতা কালীন সময়টুকুর সুযোগে নারীকে চরমভাবে বঞ্চিত ও নির্যাতন করছে।  এই সমাজে পুরুষ কী আদতে স্বাধীন যে নারীকে সে শৃঙ্খলিত করছে? না স্বসৃষ্ট বৈষম্যের সমাজে পুরুষ নিজেও সিস্টেমের দাস। তার শিক্ষা, রুচি, চেতনাকে নিয়ন্ত্রণ করছে ব্যবস্থা। যে ব্যবস্থায় চাইলেই সে মুক্তবুদ্ধির চর্চা করতে পারে না। নারীকে সম্মান জানাতে সে শিখে না। শিখে না নারীকে মর্যাদা দিতে। ক্ষমতাসম্পন্ন চক্র জন্ম দিয়েছে এক অবিচ্ছেদ্য তন্ত্রের, যাকে আমরা বলছি পুরুষতন্ত্র। এই তন্ত্র দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে পুরুষের চিন্তার জগত, ব্যবহারিক জীবন। এবং রাষ্ট্র সর্বোতভাবেই সেই পুরুষতন্ত্রকেই পৃষ্ঠপোষকতা করছে নিজ স্বার্থে। 
এই ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রিত পুরুষতান্ত্রিক সমাজে ও ব্যবস্থায় নারী তবে কার কাছে মুক্তি প্রত্যাশা করছে? নারী নিজেই কী মুক্ত পুরুষতান্ত্রিক চিন্তা থেকে।  

না। আমি একাধিক নারীকে চিনি যারা নারীর বয়স হয়ে যাওয়াকে অপরাধ মনে করে। নারীর পিরিয়ড হওয়া এবং মনোপজ হওয়াকে অভিশাপ মনে করে। সন্তানের অসুস্থতার জন্য কর্মস্থলে কুকড়ে গিয়ে ছুটি প্রার্থনা করে অপরাধবোধে ভুগতে ভুগতে। আমি একাধিক নারীকে চিনি যারা অত্যাধুনিক পোশাক পরে বলেন আমার স্বামী পছন্দ করেন তাই, আবার আপাদমস্তক পর্দায় ঢেকে বলেন আমার স্বামী পছন্দ করেন তাই!  নারীর নিজের মনোজগতেরই তো মুক্তি নেই, যে সে বাইরে মুক্তি প্রত্যাশা করে! আর পুরুষকূল। 

তাই, হে পুরুষক‚ল আপনি আজ যে নারীকে সন্তানের অসুস্থতার কারণে ছুটি দিচ্ছেন আপনি জানেন না এই ছুটি জমা হচ্ছে আপনার জাতির ভবিষ্যতের হিসাব নিকাশের ঘরে। মানবিক হয়ে উঠা উন্নত বিশ্বের সমাজ কিন্তু তা ঠিক উপলব্ধি করছে। ফলে নারীর কর্মস্থল হয়ে উঠেছে সন্তান বান্ধব। নারীর জন্য নির্ধারিত হচ্ছে সর্বোচ্চ সুযোগ ও সুবিধা। এতোসব প্রতিবন্ধকতা ডিঙিয়ে নারী উঠে দাঁড়াচ্ছে। উঠে দাঁড়াচ্ছে আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশেই। আমাকে নারী লেখক বলে নারী নাট্যকার বলে অবমূল্যায়িত করার প্রচেষ্টাকে আমি যদি অপমানজনক মনে করি আমি কী অস্বীকার করতে পারি এই পরিচয়গুলো অর্জন করতে আমার যে লড়াই এবং ত্যাগ তা একজন পুরুষের তুলনায় সহস্র গুন বেশি।  দেশে নারী ফুটবল টিম মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে, দাঁড়িয়েছে ক্রিকেট টিম। আমাদের নারী পৌঁছে গেছে এভারেস্টের চ‚ড়ায়। প্রশাসন থেকে হাসপাতাল, গাড়ি চালক থেকে বৈমানিক, দেশ পরিচালনা থেকে মাটি কাটা কোথায় নেই নারী?  পরিসংখ্যান বলে, নারীর ক্ষমতায়নে ২০২০ সালের মধ্যে দেশে সাক্ষরতা সম্পন্ন নারীর সংখ্যা হবে শতভাগ। এই যে নারী বের হতে পারেনি সামাজিক স্টিগমা থেকে, এই যে নারী পথে ঘাটে মডেস্টের শিকার হচ্ছেন, এই যে নারী শিশুবস্থায় ধর্ষিত হচ্ছেন, খুন হচ্ছেন তবু কী আটকে রাখা যাচ্ছে নারীকে?  নারীর পোশাক পালটে যাওয়ায় যারা চিন্তিত তাদের বলি একবার তুলনা করে দেখুন আজ থেকে ত্রিশ বছর আগে নারীদের অবস্থানের সঙ্গে আজকের নারীদের অবস্থান। দৃষ্টি খুলে দেখুন নিম্নবিত্ত থেকে উচ্চবিত্ত কোন নারী কী ঘরে বসে অনুনপাদনশীল সময় ব্যয় করছেন? করছেন না। আমি তাই শুধু নারীদের নিয়ে খুব চিন্তিত নই। তারা ঘর থেকে বাইরে আসছে সময়ের প্রয়োজন। সময়ের প্রয়োজনেই বিচ্ছিন্নভাবে হলেও রুখে দাঁড়াবে নিজের প্রতি ঘটে যাওয়া অন্যায় নির্যাতনগুলোর। কিন্তু এসবই আপাত সমাধান।

আমাদের বরং ভাবা উচিত সামগ্রিক সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে। যে পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গিতে পুরুষ তো নারীকে মূল্যায়ন করেই না, নারী নিজেকেও নিজে মূল্যায়ন করতে জানে না। প্রয়োজন নারী এবং পুরুষের উভয়ের চিন্তাজগতের পরিবর্তন। এবং একটি উন্নত সমাজ ব্যবস্থাই কেবল পারে এর নিশ্চয়তা দিতে। 

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর