অর্ঘ্যটুকু নিয়ে যান স্যার

ঢাকা, বৃহস্পতিবার   ০৪ জুন ২০২০,   জ্যৈষ্ঠ ২১ ১৪২৭,   ১১ শাওয়াল ১৪৪১

Beximco LPG Gas

অর্ঘ্যটুকু নিয়ে যান স্যার

 প্রকাশিত: ১৯:৩৭ ১৪ মে ২০২০  

আফরোজা পারভীন, কথাশিল্পী, কলাম লেখক, সম্পাদক। জন্ম ৪ ফেব্রুয়ারি ১৯৫৭, নড়াইল। সাহিত্যের সকল ক্ষেত্রে অবাধ পদচারণা। ছোটগল্প, উপন্যাস, শিশুতোষ, রম্য, স্মৃতিকথা, অনুবাদ, গবেষণা ক্ষেত্রে ১০১টি পুস্তক প্রণেতা। বিটিভি`তে প্রচারিত টিয়া সমাচার, ধূসর জীবনের ছবি, গয়নাসহ অনেকগুলি নাটকের নাট্যকার। `অবিনাশী সাঈফ মীজান` প্রামাণ্যচিত্র ও হলিউডে নির্মিত স্বল্পদৈর্ঘ্য `ডিসিসড` চলচ্চিত্রের কাহিনিকার। রক্তবীজ ওয়েব পোর্টাল www.roktobij.com এর সম্পাদক ও প্রকাশক। অবসরপ্রাপ্ত যুগ্মসচিব

আমাদের মাঝ থেকে চিরবিদায় নিয়ে চলে গেলেন অধ্যাপক আনিসুজ্জামান। শোকের এই সময়ে একটা কথা বলতে চাই যা কখনো সামনাসামনি বলা হয়নি। আমার দেখা শ্রেষ্ঠ মানুষদের একজন আপনি, স্যার। আপনিই তিনি যার পা থেকে মাথা অবধি পুরোটাই মানুষ, কোনো ভেজাল নেই।’ একদিন স্যারের এক জন্মদিনে মনে মনে প্রথমবারের মতো কথাগুলো স্যারের উদ্দেশ্যে নিবেদন করেছিলাম। এরপর তার প্রতিটি জন্মদিনে একই কথা উচ্চারণ করেছি। ফের উচ্চারণ করলাম আজ তার বিদায়ের দিনে।

প্রবাদ আছে, ‘বিপদে বন্ধুর পরীক্ষা হয়।’ কথাটি জীবনে বহুবার শুনেছি। কিন্তু সেই কথাটা যে আমার জীবনে এমনভাবে সত্য হবে ভাবিনি। স্যার কখনোই আমার বন্ধুস্থানীয় নন, সেটা ভাবার ধৃষ্টতাও আমার নেই। স্যারকে বরাবরই দূর থেকে দেখেছি একজন মহৎ মানুষ, একজন শিক্ষক আর দেশপ্রেমিক হিসেবে। কিন্তু স্যার যে এত কাছের, এত আপন আর সাদাসিধে মানুষ তা স্যারের কাছে না গেলে জানতাম না।

মনে পড়ে সেদিনটার কথা। এডর্ন পাবলিকেন্সের একটা অনুষ্ঠানে গিয়েছিলাম জাদুঘরে। স্যার ছিলেন প্রধান অতিথি। এর আগে অল্প-স্বল্প কথা হয়েছে স্যারের সঙ্গে দু’চারবার। অন্তর্মুখি মানুষ আমি, খুব কাছে যাবার চেষ্টা করিনি কখনই। আমি সামনের সারিতে বসা। স্যার এলেন, উঠে দাঁড়িয়ে সালাম করলাম। স্যার আমার কাঁধে হাত রেখে বললেন, ‘কেমন আছো আফরোজা। চেহারা এত মলিন দেখাচ্ছে কেন?’  অভিভূত হলাম, স্যার এভাবে আমার নাম মনে রেখেছেন! স্নেহের স্পর্শ পেয়ে চোখে জল এলো। সে জল চেপে রাখতে পারলাম না। ধরা গলায় বললাম, ‘স্যার আমার হাসবেন্ড মারা গেছেন।’ 
‘সেকি, বলছ কী!’ আমার কাঁধ থেকে হাত খসে পড়ল স্যারের। পরক্ষণে আরো নিবিড়ভাবে হাতটা রাখলেন কাঁধে। বললেন, ‘কিছুই জানি না আমি।’ 

যেন স্যার আমার কত আপনজন। যেন স্যারের জানবারই কথা ছিল।

এবার চোখ থেকে টপ টপ করে জল গড়িয়ে মেঝে ভিজাতে লাগল। স্যার, করুণ চোখে সেদিকে তাকালেন। মঞ্চ থেকে ডাক পড়ল। স্যার উঠতে উঠতে বললেন,  ‘পরে তোমার সঙ্গে কথা বলব।’ 

সেদিন অনুষ্ঠান শেষ হবার আগেই চলে গিয়েছিলেন স্যার। আমি বাসায় ফিরে এলাম। মনে একটু কষ্ট হলো। স্যারের সঙ্গে কথা বলা হলো না! আর কি কখনো এভাবে কথা বলা হবে! 

কিছুক্ষণ পরে এডর্ন পালিকেশন্সের কর্ণধার জাকির ভাই ফোন করলেন। বললেন, ‘আপা এটাই আপনার নন্বর তো? আমি চেক করে নিলাম। আনিসুজ্জামান স্যার চেয়েছেন।’

আর পরদিন দুপুরে ফোন বেজে উঠল, জলদগম্ভির কণ্ঠস্বর, ‘আফরোজ আমি আনিসুজ্জামান বলছি... তুমি কি বাসায় আছ? আমি আসছি। বাসার ঠিকানাটা বলো।’ আমি অনেক কিছু পেয়ে গেলাম। 

সেই শুরু। তারপর অনেক অনেকবার স্যার আমার বাসায় এসেছেন। হাতে বানানো সিঙ্গাড়া সমুচা খেতে খেতে অনেক গল্প করেছেন। ছেলে মেয়েকে কাছে ডেকে বসিয়েছেন। ওদের সঙ্গে কথা বলেছেন, ছবি তুলেছেন, ফোন করেছেন, খোঁজ খবর নিয়েছেন। আমিও স্যারের বাসায় গিয়েছি। বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে স্যারের সঙ্গে দেখা করেছি। আমার গবেষণা অভিসন্দর্ভ ‘জহির রায়হানের চলচ্চিত্রে মানুষের অধিকার সচেতনতা ও মুক্তিযুদ্ধ’-এর জন্য স্যারের সাক্ষাৎকার নিয়েছি।

জানুয়ারি মাসের ৫ তারিখে ভাবিসহ আমার ছেলে পান্থর বৌভাতে এমপি হোস্টেলে এসেছিলেন স্যার। বউমার হাতে একটা গিফট চেক তুলে দিয়েছিলেন। ও কিছুতেই নিতে চাচ্ছিল না। স্যার আর ভাবি ছেলে বউমাকে আদর করে বলেছিলেন, ‘এটা নিতে হয়, আমাদের আর্শিবাদ।’ আমি বাসায় ফিরে পান্থকে বলেছিলোম, ‘সব চেক ভাঙাবে, এটা ভাঙাবে না। এটা আনিসুজ্জামান স্যারের দেয়া। এর কোনো মূল্য হয় না।’

বেশ কিছুদিন ধরে স্যার অসুস্থ। সেদিনও কষ্ট করে এসেছিলেন। অনেকে অবাক হয়ে বলেছিল, ‘একটা বিয়ের দাওয়াতে স্যার এসেছেন সস্ত্রীক!’ আমি তাদের বলতে পারিনি অনেক বেশি ভালোবাসলে, কাছের জানলে এটা করা যায়! 
সর্বশেষ গত ফেব্রুয়ারিতে বিশ্ববিদ্যালয়ে স্যারের রুমে গিয়ে সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম ‘বঙ্গবন্ধুর ভাষণে মানবাধিকার গ্রন্থ’-এর জন্য। স্যার খুব অল্প বলতেন। কিন্তু লাখ লাখ কথায় যা হতো স্যারের পাঁচ মিনিটের কথায় আমি তাই পেতাম। তার কথা ছিল আকর কথামালা। তিনি জানতেন কতটুকু বলতে হবে। লিখতে হবে কতটুকু। তাই তার লেখাতেও আমার বিন্দুতে সিন্ধুর দেখা পাই। স্যারের সাথে যখনই দেখা হতো বলতেন, ‘এই যে তোমার গবেষণাধর্মী লেখা এগুলো আমার খুব পছন্দ। তুমি লিখে যাও। ভাল করবে।’ বেশি কথা বলতেন না স্যার। যেটুকু বলতেন সেটুকুই আমার জন্য অমূল্য ছিল।

একসঙ্গে দুজন সেদিন লিফট দিয়ে নেমেছিলাম। আমি গাড়িতে না ওঠা পর্যন্ত স্যার উঠতে চাননি। বোধহয় ভাবছিলেন আমার সত্যি সত্যি গাড়ি আছে কীনা! আমি আমার গাড়ি ডেকে পাশে দাঁড়ালে স্যার তার গাড়িতে উঠে গিয়েছিলেন। লিফট দিয়ে নামতে নামতে স্যার বলেছিলেন, ‘শরীরটা ভালো না। খুব ইচ্ছে একদিন তোমার পান্থপথের বাসায় গিয়ে বউমার হাতের রান্না খাওয়ার।’ আমি ভীষণ খুশি হয়ে সঙ্গে সঙ্গে বলেছিলাম, ‘আজই চলুন না স্যার।’ স্যার হেসে বলেছিলেন, ‘আজ না, একজনকে কথা দেয়া আছে। আরেকদিন।’ একথা বলে বরাবরের মতো তিনি আমার কাঁধে হাত রেখেছিলেন। আমি তার চমৎকার পাঞ্জাবিটার দিকে তাকিয়ে বলেছিলাম, ‘স্যার পাঞ্জাবিটা খব সুন্দর!’ স্যার হাসতে হাসতে বলেছিলেন, ‘ভিতরে রঙ না থাকলে বাইরে রঙ চড়াতে হয় বুঝেছ আফরোজ।’ খুব রসিক ছিলেন স্যার। 

স্যার বার বার অসুস্থ হয়ে পড়ছিলেন। একটু ভালো হচ্ছিলেন আবার অসুস্থতা গ্রাস করছিলো তাকে। মাসখানেক আগে শেষ কথা বলেছিলাম ফোনে। স্যার বলেছিলেন, ‘ভালো নেই আফরোজা।’ ‘ভালো নেই’ এই কথাটা তার মুখ থেকে এই প্রথম শোনা। ভীষণ মুষড়ে পড়েছিলাম। কিন্তু ওই অবস্থার মধ্যেও তিনি নাম করে করে সবার খোঁজ নিতে ভোলেননি। মেয়ে পারিজাত আমেরিকান বিশ্ববিদ্যালয়ে গ্রাজুয়েট অ্যাসিসট্যান্টশিপসহ মাস্টার্সে চান্স পেয়েছে শুনে বলেছিলেন, ‘ওর জন্য অনেক শুভকামনা।’ 

স্যার এই করোনার মধ্যে নানারকম জটিলতা নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হলেন। শুধু চিন্তিত নয়, ভীতও ছিলাম। প্রতিদিনই খোঁজ নিচ্ছিলাম। মাঝখানে খুব খারাপ হলেও কাল শুনেছিলাম, একটু ভালোর দিকে। কিন্তু কোনো ভালো আর আমাদের জীবনে আলো হয়ে এলো না। বিবর্ণ বিকেলটা আরো বিবর্ণ হয়ে গেল। ধূসরতায় ছেয়ে গেল চারদিক। সততার প্রতিমূর্তি, অসাধারণ বাগ্মি, পন্ডিত আর দরদী মানুষটি চলে গেলেন চিরতরে। আর কোনদিন আমার ড্রইংরুমে এসে বসবেন না। বলবেন না, ‘সিঙ্গাড়াগুলো খেতে বেশ।’ আমিও আর কোনো বুধবার এগারোটার থেকে একটার মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই নির্দিষ্ট কক্ষটিতে যাবো না। এভাবেই বুঝি সব শেষ হয়ে যায়!  

আনিসুজ্জামান স্যারের মতো সমব্যথী সমমর্মি মানুষ এ পৃথিবীতে কমই আছে। আমার জীবনে তেমন বিশেষ কিছু প্রাপ্তি নেই। যেটুকু আছে তার অন্যতম স্যারের স্নেহ আর আশীর্বাদ পাওয়া। তাতেই আমি ধন্য। 

আমি আমার অন্তরের শ্রদ্ধাটুকুই আপনাকে অর্ঘ্য দিলাম স্যার। যেখানে গেছেন, ভালো থাকুন। ভালো আপনি থাকবেনই। কারণ আপনি এক মহান আত্মা, অসাধারণ মানুষ আনিসুজ্জামান।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর