Alexa অভিনন্দন গুলতেকিন, ভালো থাকুন শাওন!

ঢাকা, রোববার   ০৮ ডিসেম্বর ২০১৯,   অগ্রহায়ণ ২৩ ১৪২৬,   ১০ রবিউস সানি ১৪৪১

অভিনন্দন গুলতেকিন, ভালো থাকুন শাওন!

 প্রকাশিত: ১৮:১৫ ১৪ নভেম্বর ২০১৯  

অাফরোজা পারভীন, কথাশিল্পী, কলাম লেখক, সম্পাদক। জন্ম ৪ ফোব্রুয়ারি ১৯৫৭, নড়াইল। সাহিত্যের সকল ক্ষেত্রে অবাধ পদচারণা। ছোটগল্প, উপন্যাস, শিশুতোষ, রম্য, স্মৃতিকথা, অনুবাদ, গবেষণা ক্ষেত্রে ১০১টি পুস্তক প্রণেতা। বিটিতে প্রচারিত টিয়া সমাচার, ধূসর জীবনের ছবি, গয়নাসহ অনেকগুলি নাটকের নাট্যকার। `অবিনাশী সাঈফ মীজান` প্রামাণ্যচিত্র ও হলিউডে নির্মিত স্বল্পদৈর্ঘ্য `ডিসিসড` চলচ্চিত্রের কাহিনিকার। রক্তবীজ ওয়েব পোর্টাল www.roktobij.com এর সম্পাদক ও প্রকাশক। অবসরপ্রাপ্ত যুগ্মসচিব

গুলতেকিন খান বিয়ে করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুলতেকিন-আফতাব আহমেদের ছবি ভেসে বেড়াচ্ছে। 

বুধবার ছিল হুমায়ূন আহমেদের জন্মদিন। একদিকে তাকে নিয়ে টেলিভিশনে ছিল নানান অনুষ্ঠান, ছিল ফেসবুকে ভক্ত পাঠকদের পোস্টের ঝড়, তার মাঝেই ভেসে এলো গুলতেকিন-আফতাবের হাস্যোজ্জ্বল ছবি। কেনো জন্মদিনের দিনটিকেই বিয়ের সংবাদ প্রকাশের দিন হিসেবে বেছে নিলেন তারা সেটা বোধগম্য নয়। শুনেছি বিয়ে হয়েছে ক’দিন আগে। তাহলে খবরটা তখনই চাউর হতে পারত। তা না হয়ে হুমায়ূনের জন্মদিনটা কেনো? আমাদের দেশে কেমন যেন একটা দেখে নেবার ব্যাপার প্রত্যক্ষ করি বার বার। ১৫ আগস্টে কেক না কাটলে হয় না, একজনের বেদনার দিন অন্যের আনন্দ করতেই হবে। কেমন একটা পাল্টা পাল্টি ব্যাপার। জন্মদিনে হুমায়ূন স্মরিত হবেন কিন্তু সেখানে ভাগ বসালেন গুলতেকিন-আফতাব। না এটা কোনো দোষের নয়। এদিন হাজার হাজার মানুষের বিয়ে হয়েছে। গুলতেকিন যদি হুমায়ূনের আগের স্ত্রী না হতেন তাহলে এ বিষয়ে কোনো কথাই উঠত না। কিন্তু তিনি একটা সম্পর্কে সম্পর্কিত ছিলেন। তাই! তবু যদি আমরা এভাবে ধরে নিই হুমায়ূনের জন্মদিন একটা আনন্দের দিন, গুলতেকিনের বিয়ের দিনও একটা আনন্দের দিন তাহলে ঠিক আছে। কিন্তু অন্য কোনো দিন হলে যেন একটু বেশি ভালো হতো। এ মত একা আমার নয়, ফেসবুকে ইতোমধ্যে অনেকেই এ মত ব্যক্ত করেছেন। 

ব্যক্তিগতভাবে আমার শাওন বা গুলতেকিন কারো সাথেই পরিচয় নেই। কারো ব্যাপারে আমার কোনো অভিযোগও নেই।  হুমায়ুন আহমেদের সাথে অল্প-স্বল্প পরিচয় ছিল। একবার ‘জোছনা ও জননীর গল্প’ নিয়ে তাঁর সাথে কিছুক্ষণ কথাও হয়েছিল। সে কথার মাঝে খানিকটা অভিযোগও ছিল। যেহেতু আমার ভাই আর তার পিতা একই সঙ্গে পিরোজপুরে একই দিনে শহিদ হয়েছিলেন, কেমন যেন একটা অদেখা বাঁধনও ছিল। তবে আমার ঘনিষ্ঠতা ছিল তাঁর মা আয়েশা খালাম্মার সঙ্গে। চমৎকার মহিলা, খুব ভালোবাসতেন আমাকে। নুহাশ পল্লীতে আমি একাধিকবার গিয়েছি। হুমায়ূনের স্বপ্নের নুহাশ পল্লী ঘুরে ঘুরে দেখেছি, দেখেছি তার ভেষজ বাগান, লেখার টেবিল। মানুষটিকে আমি পছন্দ করি, আমি তার লেখার ভক্ত। তার সংলাপ আমাকে মুগ্ধ করে । বিশেষ করে তার মতো ‘হিউমার’ আর কোনো লেখকের লেখায় পাই না। সেজন্য তার অভাবও বোধ করি প্রতি পলে । হুমায়ূনের সব কিছু ফেলে দিলেও ‘নন্দিত নরকে’ আর ‘শঙ্খনীল কারাগার’ ফেলার সাধ্য করো নেই। সাধ্য নেই আগুনের পরশমনি চলচ্চিত্র, কোথাও কেউ নেই, সেই সব দিনরাত্রি আর বহুব্রিহীর মতো নাটককে অস্বীকার করার। সাধ্য নেই ভোলার হুমায়ূন সৃষ্ট চরিত্র ‘মিসির আলী’ বা ‘হিমু’কে। তাই হুমায়ূন চলে যাবার পরও তার জনপ্রিয়তা এতটুকুও কমেনি। প্রতি বইমেলায় সেটা স্পষ্ট বোঝা যায়!

ধনী পরিবারের মেয়ে গুলতেকিন ভালোবেসে বিয়ে করেছিলেন লেখক হুমায়ূনকে। সাধারণত লেখকদের জীবনে এমনই ঘটে। তাদের চারটি সন্তানও রয়েছে। হুমায়ূন যে গুলতেকিনকে ভালোবাসতেন তার অজস্র প্রমাণ ছড়িয়ে আছে তার লেখায়। যারা লেখককে চেনেন না তারা তো তাকে লেখা দিয়েই বিচার করবেন। গুলতেকিনের রূপ-গুণের, ত্যাগের প্রশংসা হুমায়ূন অনেকবার করেছেন। হুমায়ূন শাওনের প্রেমে পড়লেন। শাওন তার মেয়ে শিলার বান্ধবী। এটা অনেকেই খুবই গর্হিত চোখে দেখেছেন। প্রথমত মাঝবয়সে অল্পবয়সী একটা মেয়ের সাথে প্রেম, দ্বিতীয়ত মেয়ের বান্ধবী। এখন প্রশ্ন হচ্ছে এমন অসম প্রেম, অসম বিয়ে কি পৃথিবীতে এই প্রথম ঘটলো? জানি পাঠকরা লেখকদের শুদ্ধ ইমেজ দেখতে ভালোবাসেন। ঠিক আছে। কিন্তু ভুললে তো চলবে না, লেখক দেবতা নন, মানুষ। তার অন্তরের একটা চাহিদা আছে। আর শাওন  তো শুধুই শিলার বান্ধবী পরিচয়ে পরিচিত নন। শাওন একজন ভালো অভিনেত্রী, গায়িকা, নৃত্যশিল্পী। ভালো বলেন তিনি। পেশায় স্থাপত্য প্রকৌশলী। একজন মানুষের যা যা গুণাবলী থাকা সম্ভব সবই তার আছে। পারিবারিকভাবেও তিনি উজ্জ্বল। হুমায়ূন আহমেদের মতো মানুষ যখন একজনকে ভালোবেসে এতোবড় সিদ্ধান্ত নেয়, মোহে নেয় না। মুগ্ধ হয়েই নেয়। হুমায়ূনকে মুগ্ধ করার গুণ শাওনের ছিল, আছে। আমার তো মনে হয় হুমায়ূন আহমেদের সাথে বিয়ে না হলে শাওনের নিজ পরিচয়টা আরো উজ্জ্বল হতো। হুমায়ূন আহমেদের স্ত্রী হয়ে, দুটো বাচ্চার মা হয়ে  তিনি নিজ পরিচয়কে সীমিত করে ফেলেছেন। নিজেকে সেভাবে উদ্ভাসিত করার সুযোগ পাচ্ছেন না। খানিকটা আগলবন্দি করে ফেলেছেন নিজেকে। বরং হুমায়ূনকে বিয়ে করে অনেক ঝড় ঝাপটা পোহাতে হয়েছে শাওনকে। সইতে হয়েছে অজস্র কটূক্তি নিন্দাবাক্য। মুখোমুখি হতে হয়েছে অনেক অযাচিত প্রশ্নের। ‘ আপনি বান্ধবীর বাবাকে বিয়ে করেছেন’ এই কথায় বার বার ক্ষতবিক্ষত হতে হয়েছে তাকে। এক্ষেত্রে তার উত্তর, ‘আমি বান্ধবীর বাবাকে বিয়ে করিনি, শিলা আমার বন্ধুর মেয়ে।’  হুমায়ূন বড় লেখক বলে সেসব তাকে যতটা স্পর্শ করেছ তার চেয়ে অনেক বেশি করেছে শাওনকে। 

গুলতেকিন সুন্দরী। ভালো পরিবারের মেয়ে। শিক্ষিত, রুচিশীল। কিছুদিন আগেও শিক্ষকতা করতেন। বর্তমানে করেন কীনা জানি না। বছর দুয়েক আগে তাঁর একটা কবিতার বই বেরিয়েছে। খ্যাতিও পেয়েছেন। তার জন্য আমাদের সহমর্মিতা আছে। সত্যি কথা বলতে কী শাওনকে বিয়ে করার পর সারাদেশ তার পক্ষেই ছিল। এখনও আছে। তার বিয়ের খবরে একটাও অযাচিত বা অশালীন মন্তব্য চোখে পড়েনি। দেশের মানুষ মনে করে শাওনকে বিয়ে করে হুমায়ূন গুলতেকিনের প্রতি অন্যায় করেছিলেন, তাই গুলতেকিনের ব্যাপারে সবার সহানুভূতি।

গুলতেকিন-–আফতাবের বিয়ের ব্যাপারে তাদের যতটা আনন্দ তার চেয়ে অনেক বেশি আনন্দ তিনি বিয়ে করে দেখিয়ে দিলেন বলে। হুমায়ূন বেঁচে থাকলে এই আনন্দটা আরো শতগুণ হতো বলে আমার বিশ্বাস। অনেকে তাদের বিয়ের খবরে তাঁর সাহসের প্রশংসা করেছেন। বাঙালি বিধবা আর ডিভোর্সির  কষ্টকর জীবনের কথা বলেছেন। সমাজের কারণে বিধবা বা ডিভোর্সি নারী বিয়ে করতে পারেন না এমন কথাও বলেছেন। এই কথাগুলো এখন আর তেমন খাটে না। বিধবা বা ডিভোর্সি নারী সমাজের ভয়ে বিয়ে করেন না কিছু ক্ষেত্রে এটা সত্য, কিন্তু  তারা বিয়ে করলেই যে সমাজ তেড়ে আসে এমনও নয়। নারীরা বিয়ে করেন না অধিকাংশ ক্ষেত্রে সন্তানের কথা ভেবে। নিজেকে বঞ্চিত করেন চিরন্তন মাতৃত্বের তাগিদে। কখনো কখনো পূর্ব স্বামীর প্রতি ভালোবাসা লালন করেন বলে। যেমন  লেখক নবনীতা দেব সেন বিয়ে করেননি। অমর্ত্য সেন এক বিদেশি মহিলাকে বিয়ে করলেও তিনি দুই মেয়ে অন্তরা আর নন্দনাকে নিয়ে একাই ছিলেন আমৃত্যু। নবনীতার মা বিখ্যাত রাধারানী দেবের এক সাক্ষাৎকারে পড়েছিলাম, ‘খুকু (নবনীতা) সারাজীবন বাবলুকেই( অমর্ত্য সেন)  শুধু ভালোবেসেছে।’ সম্প্রতি প্রয়াত হয়েছেন নবনীতা দেব  পসন। তার মৃত্যুর পর প্রথম সংবাদটা অমর্ত্য সেনকেই দেয়া হয়েছে। তাই শুধু শুধু সবক্ষেত্রে সমাজকে দোষ দেবার কিছু নেই। বাঙালি যে ক্রমশ উদার আর আধুনিক হয়ে উঠছে গুলতেকিনের বিয়ে তার প্রমাণ। সবাই তাঁকে অভিনন্দিত করছে, প্রশংসা করছে আফতাব আহমেদকে। আফতাব আহমেদকে আমি ব্যক্তিগতভাবে চিনি  না। জানা গেছে বেশ ক’বছর ধরে তার এবং গুলতেকিনের বন্ধুত্ব। অবশেষে বিয়ে। তিনিও একজন কবি। 

দীর্ঘ রোগভোগের পর হুমায়ূন চলে গেছেন ২০১২ সালে। এখন ২০১৯। শাওন বিয়ে করেননি। হুমায়ূনের স্মৃতি আগলে তার দুটো সন্তান নিয়ে আছেন। হুমায়ূনের সাথে সম্পর্কের আগে পরে তাকে নিয়ে কোনো সমালোচনা শুনিনি। তার প্রতি দেশের মানুষের যে তীব্র অনীহা ছিল কাজ দিয়ে তিনি অনেকটাই তা কাটিয়ে উঠেছেন। কখনোই তিনি হুমায়ূন পরিবার বা গুলতেকিনের  প্রতি কোনো খারাপ মন্তব্য করেননি। বরং হুমায়ূনকে বাঁচিয়ে রাখার তার আপ্রাণ চেষ্টা। ‘ডুব’ নিয়ে তার শক্ত অবস্থান আমরা দেখেছি। হুমায়ূন মারা যাবার পর গুলতেকিন একটি খোলা চিঠি লিখেছিলেন। ওই চিঠিটা তিনি না লিখলেই পারতেন। কারণ আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য হুমায়ূন তখন ছিলেন না। আর একসময় যার সাথে এতোগুলো বছর সংসার করছেন মৃত সেই মানুষটিকে নিয়ে টানাহিঁচড়া না করলেই বরং প্রমাণ হতো তিনি হুমায়ূনকে যথার্থ ভালোবাসতেন।
 হুমায়ূনের বিষয় সম্পত্তি বা তার বইয়ের কপি রাইট নিয়ে দু পরিবারে কি অবস্থা আমাদের জানা নেই। হুমায়ুনের মৃত্যর পর তার মরদেহ সমাধিস্থ করা নিয়ে যে নাটকীয় অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল তা দেশবাসী দেখেছে। নুহাশের একটি আবেগতাড়িত লেখা পড়েও আমরা মর্মাহত হয়েছি। বাবা যদি ছেলেকে দেখতে না পায় আর ছেলে যদি বাবার কাছে না যেতে না পারে  সেটা সত্যিই খুব কষ্টের। পাশাপাশি এটাও বলব, হুমায়ুন শাওনের ভালবাসাও কোনো দোষের নয়। 

ভালোবাসা সতত প্রবাহিত, কূলপ্লাবী। দিনক্ষণ দেশকাল বয়স সম্পর্ক কিছুই মানে না। দোষের নয় হুমায়ূন শাওনের ভালোবাসা, গুলতেকিন-আফতাবের ভালোবাসা। তাই ভালোবাসা নিয়ে কাদা ছোঁড়াছুঁড়ি না করে বরং ভালোবাসার দৃষ্টিতেই দেখা উচিত। অভিনন্দন গুলতেকিন! ভালো থাকুন শাওন। চির শ্রদ্ধা প্রিয় লেখক হুমায়ূন আহমেদ।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর