অভাবই জামিলাকে কসাই বানিয়েছে

ঢাকা, সোমবার   ০৬ এপ্রিল ২০২০,   চৈত্র ২৩ ১৪২৬,   ১২ শা'বান ১৪৪১

Akash

অভাবই জামিলাকে কসাই বানিয়েছে

সাদিকা আক্তার  ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৭:০০ ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০   আপডেট: ১৭:১৮ ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

সকাল থেকে সন্ধ্যা মাংস কেটেই পার হয় তার। একজন নারী কসাই তিনি। বিগত ২০ বছর ধরে তিনি এই পেশায় রয়েছেন। স্বামীর কাছ থেকেই এ কাজে হাতেখড়ি তার। ছোট দুটি সন্তান রেখে স্বামী ছেড়ে যাওয়ার পর থেকেই কসাই পেশা বেছে নিয়ে জীবন ধারণ করছেন জামিলা।

প্রতিদিন তিন থেকে চারটি ও শুক্রবারে আট থেকে দশটি গরুর মাংস নিজ হাতে কেটে বিক্রি করেন তিনি। ব্যবসায়ী জামিলা বেগমের মাংসের ক্রেতা দিনাজপুর জেলাসহ পাশের নীলফামারী, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড় জেলার মানুষ। বর্তমানে কোনো কাজেই পিছিয়ে নেই নারীরা। পুরুষের পাশাপাশি নারীরাও সমানভাবে কাজ করছে সমান তালে। তারই প্রমাণ এই জামিলা। 

৫১ বছর বয়সী জামিলা বেগম। দিনাজপুরের বীরগঞ্জের তিন নম্বর শতগ্রাম ইউনিয়নের ঝাড়বাড়ীর বাজারে তার দোকান। তিনি কসাইয়ের কাজ শুরু করেন ২০০১ সালে। টানা ২০ বছরের অভিজ্ঞতায় এখন গরুর গায়ে হাত দিলেই বুঝতে পারেন, গরুটি সুস্থ নাকি রোগাক্রান্ত। অসুস্থ গরু শত অভাবে পড়েও কখনো কেনেন না তিনি।

গরুর মাংস নিয়ে দোকানে ছুটছেন জামিলাফলে তার কোনো গরু কিনে আনার পর জবাইয়ের আগ পর্যন্ত অসুখে পড়ে কখনো মারা যায়নি। জামিলা বেগম নিজে বাজারে গিয়ে দেখে শুনে গরু কেনেন। নিজের কসাই হয়ে ওঠা প্রসঙ্গে জামিলা বলেন, স্বামী কসাই হওয়ায় খুব কাছ থেকে তার এই কর্মকাণ্ড দেখেছি। তাকে সহযোগিতা করার মাধ্যমেই কাজটি রপ্ত করি।

তবে কখনো ভাবিনি এই পেশাতেই জীবন গড়তে হবে। সংসারের অভাবই আমাকে এই ব্যবসা শিখিয়েছে। প্রথম দিকে অনেক প্রতিবন্ধকতা এসেছে। কুসংস্কার ছড়িয়ে নালিশ করে আমার ব্যবসা বন্ধ করতে চেয়েছিল অনেকে। তবে মায়ের প্রেরণায় সব প্রতিবন্ধকতা দূর করে টিকে আছি।

জামিলা বেগম জানান, তার স্বামী ছোট দুইটা সন্তান রেখে বাড়ি ছেড়ে চলে যান। সেই থেকে তিনি এই ব্যবসায়ে নামেন। তার শ্বশুরের অনেক জমি ছিল এগুলো পাওয়ার পর তার স্বামী সারাক্ষণ নেশা করতো। সবগুলো বিক্রি করে যে বাড়িটা ছিল সেটাও বিক্রি করে দেয়। তারপর মানুষের বাড়িতে থাকা শুরু করেন তিনি। সেখানেও অত্যাচারিত হতে থাকেন জামিলা। এরপর দিশেহারা হয়ে বগুড়া থেকে চলে আসেন বাবার বাড়িতে। 

গরুর চামড়া কাটছেন তিনিসেখানে থাকা অবস্থাতেই তার স্বামী এক মাস পর আবার ফিরে আসেন। তিনি দোকান করবেন বলে জামিলার কাছে টাকা চান। তখন সন্তানদের মুখ পানে চেয়ে স্বামীর সব দোষ মাফ করে তিনি টাকা জোগাড়ের প্রচেষ্টা শুরু করেন। বাধ্য হয়ে জামিলা তার ভাইয়ের দুইটি গরু বিক্রি করেন। এছাড়াও ধার করা টাকায় দোকান করে দেয় তার স্বামীকে। 

তবে কিছু দিনের মাথায় জামিলাকে না জানিয়েই তার স্বামী দোকান বিক্রি করে টাকাগুলো নিয়ে চলে যায়। আবারো এক ঝটকায় অমানিশা নেমে আসে জামিলার জীবনে। পাওনাদাররা টাকার জন্য জামিলার ওপর খুব চাপ দিতে থাকে। কারণ তার স্বামীকে নয় বরং জামিলাকে বিশ্বাস করেই তারা ধার দিয়েছিল। তখন জামিলা কোনো দিশা না পেয়ে কসাইয়ের কাজ শুরু করেন।  

২০০১ সালে দিনাজপুরের ঝারবাড়ি বাজারে দোকান চালু করেন জামিলা। তার একজন নানা ছিলেন গরুর দালাল। তিনিই জামিলাকে বাকিতে গরু কিনে দেয়। তখন একটা চৌকির উপরে কাপড়ের ছাউনি আর আশেপাশে চারটি খুঁটি দিয়ে দোকান শুরু করেন জামিলা। সেই কাপড়ের ছাউনি থেকে এখন তিন পাশে দেয়াল তুলে দোকান দিয়েছেন তিনি।

গোয়াল পরিষ্কার করছেন জামিলানারী হয়ে কসাইয়ের কাজ করায় অনেক সমালোচনার শিকার হয়েছেন জামিলা। তখন অনেকেই অনেক কথা বলেছে শুনেও না শোনার ভান করে থাকতেন তিনি। সেখানে আরো ১৪ থেকে ১৫ জন কসাই ছিল। অনেকেই খারাপ মন্তব্য করেছেন। যদিও প্রথমে জামিলা ততটা ভালোভাবে মাংস কাটতে পারতেননা তবে এখন তার হাত পুরো পাকা। 

হাট থেকে গরু কিনে নিয়ে আসেন জামিলা। ভোরে মসজিদের ইমাম সাহেবকে দিয়ে গরু জবাই করেন। এরপর নিজেই গরুর চামড়া ছড়িয়ে তিন ভাগ করে দোকানে নিয়ে আসেন। দিনে দুই থেকে তিনটি গরু জবাই করে মাংস বিক্রি করেন জামিলা। মাংস বিক্রির টাকা দিয়ে জায়গা কিনে ঘর তুলেছেন জামিলা।  

তার ছেলে এখন বড় হয়েছে। সেও তার মায়ের সঙ্গে ব্যবসার দেখাশোনা করেন। সে এখন আর তার মাকে কাজ করতে দিতে চায় না। তবে কাজ না করে যে জামিলা বসে থাকতে পারেন না। তাই যতদিন শক্তি রয়েছে ততদিন তিনি এ কাজ করেই যেতে চান। 

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএমএস