ঢাকা, শুক্রবার   ২২ ফেব্রুয়ারি ২০১৯,   ফাল্গুন ৯ ১৪২৫,   ১৬ জমাদিউস সানি ১৪৪০

অবসেসিভ কম্পালসিভ ডিসঅর্ডার- শুচিবাই যখন অসুখ

মেহজাবিন তুলি

 প্রকাশিত: ০৭:২১ ১০ আগস্ট ২০১৮   আপডেট: ০৭:২১ ১০ আগস্ট ২০১৮

ছবি- সংগৃহীত

ছবি- সংগৃহীত

বাসা থেকে বের হয়ে গাড়িতে চড়ে বসেছেন, হঠাৎ আপনার মনে হলো হয়ত বের হবার সময় ভালভাবে তালাটা দেয়া হয়নি। সারাটা দিন একই চিন্তায় আপনি কাতর হয়ে রইলেন। 

ঘুমের মাঝখানে আপনার মনে হলো গ্যাসের চুলাটা বোধহয় নেভানো হয়নি। একদিন দুদিনের ঘটনা নয়, প্রায়ই আপনার ঘুমের সময় মনে হয় এ কথাটা আর আপনি তড়াক করে উঠে তা দেখতে যান। ঘরের ভেতরে সব কিছু নিঁখুতভাবে সাজিয়ে রাখার অভ্যাস আপনার।আপনার গোছানো টেবিল, বিছানা, ঘরের আসবাব কেউ একটু এলোমেলো করলেই ভীষণ বিরক্ত হয়ে পড়েন। সোফার কুশনটা কেউ একটু হেলে রেখে দিয়েছে,পর্দাটা টেনে একপাশ করে রেখেছে, ব্যাস আপনি ব্যস্ত হয়ে যাবেন সেসব নতুন করে সাজাতে। আর এ কাজ করতে গিয়ে প্রায়ই নিয়ে ফেলেন প্রয়োজনের অতিরিক্ত সময়। 

কোথাও বেড়াতে গেলে আপনি কিছুতেই সেখানকার বাথরুম ব্যবহার করেন না।ব্যাগে বেশি টাকা থাকলে কিংবা কারো থেকে টাকা ধার নিলে বারবার তা গুণে দেখেন ঠিক আছে কিনা। প্রয়োজনীয়,অপ্রয়োজনীয় সব কিছু আপনি সংগ্রহে রেখে দেন এই ভেবে যে ,পরে যদি কাজে লেগে যায় তা! 

হাতে কোন ময়লা লেগে নেই,তবু হয়তো আপনি বারবার হাত ধোন। ময়লা লেগে যাবার ভয়ে হয়তো হাত দিয়ে টাকা পয়সাও ধরতে চান না আপনি! ছেঁড়াফাটা ময়লা নোট হাত দিয়ে ধরলে কমপক্ষে পাঁচ থেকে ছয়বার আপনার সাবান দিয়ে হাত ধোয়া চাই ই চাই। আপনি নিজেও কিন্তু বুঝতে পারছেন এত বার হাত ধোয়াটা বাড়াবাড়ি ছাড়া কিছু নয়। কিন্তু তবু নিজেকে কাজটা থেকে বিরত রাখতে পারছেন না।আবার যতবার বাইরে যান, বাড়ি ফিরে আপনাকে হয়তো কাপড় বদলাতেই হবে।

এ সবগুলো লক্ষণ যে রোগটাকে নির্দেশ করে তা হলো অবসেসিভ কম্পালসিভ ডিসঅর্ডার বা সংক্ষেপে ওসিডি। বাংলায় একে ‘শুচিবাই’ও বলা হয়ে থাকে।এক ব্যক্তির মধ্যেই যে সব লক্ষণ দেখা দেবে এমন নয়।আবার সব যে একসাথে দেখা যাবে এমনও না। এগুলোর কোনটিকেই স্বাভাবিক অভ্যাস বলে এড়িয়ে যাওয়া যাবে না। রোগটি একটি হয়তো মাইনর মেন্টাল ডিসঅর্ডার । তবে ভোগান্তি কম নয়। 

মানুষের জীবনে লেখাপড়া,ক্যারিয়ার,প্যাশন অনেক ক্ষেত্রেই আসলে অবসেশান থাকে, থাকাটা  উচিতও। কিন্তু সেটা যদি মাত্রাতিরিক্ত হয়ে গিয়ে দৈনন্দিন জীবনের মূল্যবান  সময় নষ্ট করে এবং  স্বাভাবিক কর্মকান্ডের ব্যাঘাত ঘটায়, তাহলে তাকে রোগ হিসেবেই বিবেচনা করতে হবে।
 
এ রোগাক্রান্তদের শুধু অবসেশান থাকতে পারে, শুধু কম্পালসান থাকতে পারে,আবার দুটি একসাথেও থাকতে পারে। অবসেশনের জন্য একই ধরনের চিন্তা,অনুভূতি বা অবয়ব বারবার মনের মধ্যে এসে ব্যক্তির মাঝে তীব্র উৎকণ্ঠা আর মানসিক চাপ তৈরী করে। 

আক্রান্ত ব্যক্তি সে অনুভূতিকে দমন করতে চান এবং সে জন্য একই কাজ বার বার করতে শুরু করেন।বলা যায়,নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধেই অনিয়ন্ত্রিত মন বার বার তাকে কাজটি করাবে! এটা কম্পালসান। যেমন- হাত ময়লা আছে (অবসেশান) মনে করে বার বার হাত ধুয়ে আসা(কমপালসান)

অবসেশান বিভিন্নভাবে ব্যক্তির ভেতর আসতে পারে। কারো থাকে পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা নিয়ে, কারো অন্য বা নিজের ক্ষতি নিয়ে ,কারো জিনিসপত্র গোছানো নিয়ে, কারো হতে পারে এমনকি ধর্ম নিয়েও। নামাজে হয়তো দেখা যায় বারবার সুরা ভুল হয়ে যায় কিংবা ওযু করার কথা মনে থাকে না।  অথবা দেখা গেল, ধর্ম বা যৌনতা নিয়ে অস্বাভাবিক কোন চিন্তা ব্যক্তির মাথায় বারবার ঘুরপাক খায়। তিনি জানেন,ব্যাপারটি ভিত্তিহীন, তবু কোনভাবে মন থেকে একে সরাতেই পারেন না!  

ওসিডির ফলে ব্যক্তির মনে এমন বদ্ধমূল ধারণার জন্ম হয়, যা তার কাছে শেষ পর্যন্ত বাধ্যতামূলক বিষয় বা চিরাচরিত অভ্যাসে পরিণত হয়। অথচ সে জানে যে, তার এহেন আচরণের কোন অর্থই হয় না। ওসিডিতে আক্রান্ত কোন কোন রোগী প্রচণ্ড বিষণ্নতায়ও ভোগে। নিজেদের চরিত্রের বিপরীতে নানান চিন্তা তাদের মাঝে কাজ করে। কাছের মানুষদের প্রতি সন্দেহের উদ্রেক হয়, নানান অমঙ্গলকর চিন্তা আসে।অনেকের পারিবারিক জীবন দুর্বিষহ হয়ে ওঠে। ওসিডি মানুষকেই এতটাই যন্ত্রণা দেয় যে, মানুষের ভেতর আত্মহত্যা করার ইচ্ছাও জন্মায়!

ওসিডির হাত থেকে শিশুরাও রেহাই পায় না কিন্তু। শিশুদের ক্ষেত্রে এ সমস্যা আরো ভয়াবহ কারণ , তারা বুঝতেই পারে না যে তাদের আসলে হয়েছে কী। তাদের মাথায় সব অবাস্তব চিন্তাভাবনা ঘুরপাক খায়। আর সেগুলি তারা অন্য কাউকে বলতেও পারে না,কারণ বড়রা তাদের সেসব ফ্যান্টাসির কথা পাত্তাই দেবে না! 


চিন্তা নেই, আছে সমাধান
অন্য অনেক মানসিক রোগের মত ওসিডির সঠিক কারণও এখন পর্যন্ত অজানা। কেউ কেউ বলেন মস্তিষ্কের নিউরো ট্রান্সমিটারের তারতম্যের কারণে এ সমস্যা হয় ,আবার কেউ জেনেটিক বিষয়গুলোকে এর কারণ হিসেবে দেখেন।  ওষুধের পাশাপাশি আচরণ পরিবর্তনকারী এক ধরনের চিকিৎসা পদ্ধতি(CBT:Cognitive-Behavior Therapy) গ্রহণ করা হয়। এ পদ্ধতির মূলে আছে Exposure & Response(Ritual) Prevention Therapy। সাইকোলজিক্যাল এ চিকিৎসা পদ্ধতিটি খুব কার্যকর। এক্সপোজার পদ্ধতি বলতে বোঝায়, প্রথমত ব্যক্তির যে বিষয়টি নিয়ে খুঁতখুঁতে চিন্তা আছে, তাকে সে বিষয়টির মুখোমুখি করতে হবে।  

আর রেসপন্স প্রিভেনশন পদ্ধতিতে যে কাজটি না করলে তার মনের শান্তি আসে না, সেটি থেকে তাকে বিরত রাখতে হবে। এছাড়াও খুঁতখুঁতে চিন্তা বন্ধ করার জন্য অন্য কোন অভ্যাসের অনুশীলন করানো যেতে পারে তাকে।এ প্রক্রিয়াকে বলা যায় ‘Thought Stopping’ অর্থাৎ নেতিবাচক চিন্তাগুলোকে সাময়িক বন্ধ রাখার চেষ্টা। যেমন ব্যক্তিকে হাতে একটি রাবার ব্যান্ড বেঁধে রাখতে বলা হয়। যখনই অমূলক চিন্তা মাথায় আসবে তখন সে ব্যান্ডটিতে টান দেবে।ব্যথা পাওয়ায় তার মনোযোগ  তখন অন্যদিকে সরে যাবে। 

আরেকটি কার্যকর পদ্ধতির সাথে আমরা সবাই কমবেশি পরিচিত- ‘Relaxation Therapy’ যা খুব কম পরিশ্রমে  ‘Breathing Exercise’ এর মাধ্যমেই আমরা করতে পারি। সময় পেলেই লম্বা করে শ্বাস নিন, কয়েক সেকেন্ড ধরে রাখুন এবং তারপর আস্তে আস্তে ছাড়ুন। মনে প্রশান্তি আনতে এটুকু যথেষ্ট। 

ওসিডির চিকিৎসা সময়সাপেক্ষ,ধৈর্য ধরে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চললে সুফল পাওয়া যাবেই।কেউ কেউ  সুস্থ হবার পরেও বহুদিন পর রোগটি আবার ফিরে আসে।  পরিবারের বড় ভূমিকা আছে এ রোগ নিরাময়ে। রোগীর কোন  আচরণেই বিরক্তি প্রকাশ যাবে না, করতে হবে বন্ধুসুলভ আচরণ।তাকে যেন কোন রকম হীনম্মন্যতা,হতাশা  পেয়ে না বসে। 

অনেক বিখ্যাত ব্যক্তিবর্গ এ রোগের শিকার। হ্যারি পটার খ্যাত অভিনেতা ড্যানিয়েল রেডক্লিফ,ইংল্যান্ডের সাবেক ফুটবলার ডেভিড বেকহাম থেকে শুরু করে লিওনার্ডো ডিক্যাপ্রিও,মেগান ফক্স পর্যন্ত ওসিডিতে ভুগেছেন। এসব তারকার সফলতার গল্প নতুন করে জানানোর কিছু নেই,তাই না? এরা পারলে,আপনিও পারবেন। 

গবেষণা বলে, একশ জনের ভেতর তিন জনের অবসেশনের অসুখ আছে,কাজেই এ নিয়ে বৃথা ভাবার দরকার নেই। অবসেশনকে অগ্রাহ্য করে যেভাবে অন্যান্যরা বেঁচে  আছে, সেভাবে আপনিও থাকবেন। মাথার ভেতর যতই চিন্তা আসুক না কেন, আপনি তাকে পাত্তা না দিতে শুরু করলে দেখবেন ওসিডি  ঠিক ঝেঁটিয়ে বিদায় হয়েছে আপনার জীবন থেকে।  

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএ