Alexa অপচয় থেকে বাঁচার উপায় (পর্ব-৩)

ঢাকা, শুক্রবার   ২৩ আগস্ট ২০১৯,   ভাদ্র ৮ ১৪২৬,   ২১ জ্বিলহজ্জ ১৪৪০

Akash

অপচয় থেকে বাঁচার উপায় (পর্ব-৩)

মাওলানা ওমর ফারুক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৮:৩৯ ২০ জুলাই ২০১৯   আপডেট: ১৯:০৯ ২০ জুলাই ২০১৯

ফাইল ফটো

ফাইল ফটো

হজরত মাওলানা মুহাম্মদ ইসা (রহ.) এ মালফুজের শিরোনাম দিয়েছেন, ‘অপচয় থেকে বাঁচার উপায়।’ 

আরো পড়ুন>>> অপচয় থেকে বাঁচার উপায় (পর্ব-২)

দ্বিতীয় পর্বের পর থেকে...

এ মালফুজে হজরত থানবি (রহ.) তার একজন মুরিদকে কিছু নসিহত করেছেন। সে নসিহতগুলো এ মালফুজে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। এ সমস্ত নসিহতের ওপর আমল করা হলে ইনশাআল্লাহ অপচয় থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে। 

নসিহতগুলো ব্যাপক অর্থবোধক হওয়ার কারণে এগুলোর ওপর আমল করার দ্বারা অন্যান্য দোষ থেকেও মুক্তি লাভ হবে। প্রথমে তিনি এই নসিহত করেন যে, আল্লাহওয়ালাদের পথ ও পন্থা অবলম্বন করো। বিশেষ বেশ-ভূষার লোকদের পথ অবলম্বন করো না। প্রচলিত প্রথা-পদ্ধতি ও রীতি-নীতির মোটেই অনুগামী হয়ো না।’ (আনফাসে ইসা ১৯২)।

আল্লাহওয়ালাদের বেশ-ভূষা অবলম্বন করো: আল্লাহ তায়ালা বৈধ জিনিসের পরিধি অনেক বিস্তৃত করেছেন। তবে সেই বৈধ জিনিসগুলোর মধ্যে এমন কিছু রয়েছে, যেগুলোকে প্রত্যেক যুগের আল্লাহ তায়ালার অলিগণ গ্রহণ করে থাকেন। ফলে ওই সমস্ত বৈধ জিনিসের মধ্যে বরকত হয়ে থাকে। এর অর্থ এই নয় যে, সেগুলোর বিপরীত করাতে গুনাহ হয়। একইভাবে আল্লাহওয়ালাদের অবলম্বনকৃত সব পদ্ধতি সুন্নত হওয়াও জরুরি নয়। যেমন, পোশাক। আল্লাহ তায়ালা বৈধ পোশাকের পরিধি অনেক বিস্তৃত করেছেন। আল্লাহ তায়ালা আমদেরকে বিশেষ কোনো পোশাক পরতে বাধ্য করেননি যে, এই পোশাক পরো। শরিয়ত এমন কোনো বাধ্যবাধকতা আরোপ করেনি।

আরো পড়ুন>>> ‘মাদিনা’ হজে জন্ম নেয়া প্রথম শিশু 

প্রচলিত প্রথা ও ফ্যাশনে আবদ্ধ হয়ো না: এক প্রকারের পোশাক হলো এমন, যা যুগের আলেম ও অলিগণ অবলম্বন করেছেন। আরেক প্রকারের পোশাক হলো সেটি, যা সাধারণ মানুষ অবলম্বন করেছে। সাধারণ মানুষ যে ধরনের পোশাক অবলম্বন করেছে, তা গুনাহ নয়। তা বৈধ পোশাকেরই অন্তর্ভুক্ত। যেমন, কোনো বিশেষ ধরনের পোশাকের প্রচলন আরম্ভ হয়েছে। যার মধ্যে শরিয়তের নিষিদ্ধ কিছুও বিদ্যমান নেই। যেমন, পানজাবি, পায়জামা ও ওয়াস্কোট পরার প্রচলন চলছে। তা হলে এটা কোনো গুনাহ বা নাজায়েজ কাজ নয়, বরং এটাও বৈধ। তবে তোমরা আল্লাহওয়ালাদের পদ্ধতি অবলম্বন করার চেষ্টা করো এবং বিশেষ বেশ-ভূষার অধিকারী লোকদের পদ্ধতি অবলম্বন করার চেষ্টা করো না। বিশেষ বেশ-ভূষার লোক বলতে ফ্যাশন পূজারী লোক উদ্দেশ্য। প্রচলন ও প্রথার মধ্যে আবদ্ধ হয়ো না। অর্থাৎ, এটা দেখো না যে, বর্তমানে তো এ ধরনের পোশাক ফ্যাশনের চলছে, তাই এ পোশাকই পরতে হবে। আর অমুক পোশাক আউট অব ফ্যাশন হয়ে গেছে, তাই তা পরিত্যাগ করা উচিত।

বুজুর্গদের অনুরূপ পোশাক পরা: এখানে কয়েকটি বিষয় বুঝতে হবে, যেগুলোর ব্যাপারে আমাদের অনিয়ম হয়ে থাকে। প্রথম কথা এই যে, যে সমস্ত লোক আল্লাহওয়ালাদের অনুরূপ পোশাক পরার চেষ্টা করে; যেমন, আল্লাহওয়ালাদের কিস্তি টুপি বা গোল টুপি দেখে তাদের নকল করে বা আল্লাহওয়ালাদের নাগড়া জুতা দেখে তাদের নকল করে বা আল্লাহওয়ালাদের জামার মত জামা পরার চেষ্ট করে। বিশেষ করে যখন কোনো ব্যক্তি নতুন নতুন দীনের রাস্তায় চলতে আরম্ভ করে, তখন সে বুজুর্গদের নকল করার চেষ্টা করে।

তখন মানুষ আপত্তি উত্থাপন করে বলে যে, বুজুর্গগণের পোশাক নকল করার এবং তার প্রতি গুরুত্বারোপ করার কী দরকার আছে? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলঅইহি ওয়াসাল্লাম কী কিস্তি টুপি পরতেন? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কী এমন জুতা, এমন পানজাবি এবং এমন পাজামা পরতেন? এ ব্যাপারে তো এ কথা বলতে পারি যে, তিনি পানজাবি পরেছেন। তবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পানজাবি আমাদের পানজাবি থেকে ভিন্ন রকম ছিল। আমাদের পানজাবি খাটো হয়ে থাকে, আর তাঁর (সা.) পানজাবি ছিল লম্বা। এমনিভাবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পায়জামা পরা প্রমাণিত নেই, তবে তিনি পাজামা পছন্দ করতেন এ কথা প্রমাণিত আছে। কিন্তু এ টুপি ও জুতা পরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে প্রমাণিত নয়। এ সদরিয়া এবং ওয়াস্কোট পরা প্রমাণিত নয়। তাই মানুষ প্রশ্ন উত্থাপন করে যে, এ সমস্ত পোশাক পরা যেহেতু সুন্নত নয়, তা হলে মানুষ এগুলোর প্রতি এত মনোযোগ দেয় কেন? এবং এগুলোর প্রতি এত গুরুত্বারোপ করে কেন?

একে সুন্নত মনে করা ভুল: এর উত্তর এই যে, এ গুরুত্ব এ কারণে দেয়া হয় না যে, এগুলো পরা সুন্নত। এমনকী কোনো ব্যক্তি যদি কিস্তি টুপি বা পাঁচ কল্লি টুপি সুন্নত মনে করে পরে, তা হলে এটা পরা বেদআত এবং গুনাহ হবে। বরং এগুলোর প্রতি এ কারণে গুরুত্বারোপ হয় যে, প্রত্যেক যুগের আলেম ও নেককারগণ যে সমস্ত পোশাক পরেন, সেগুলো পরাতে ফায়দা রয়েছে। সে ফায়দা এই যে, এমন পোশাক পরার ফলে তাদের সঙ্গে নৈকট্য লাভ হয় এবং তাদের সাদৃশ্য লাভ হয় এবং এদ্দ্বারা শুভ লক্ষণ গ্রহণ করা হয় যে, আমরা যখন তাদের পোশাক গ্রহণ করেছি, তখন আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে তাদের নীতি চরিত্র এবং জীবনাদর্শ গ্রহণ করারও তাওফিক দান করবেন। তাই এ পোশাককে সুন্নত মনে করে অবলম্বন করা ভুল এবং একে জরুরি মনে করা তো মারাত্মক ভুল।

আরো পড়ুন>>> রাসূল (সা.) এর হাদিসে সুস্থতা ও অবসরের মূল্যায়ণ (পর্ব-১)  

হাফেজ মুহাম্মদ আহমদ (রহ.) এর ঘটনা: যেমন, আমাদের বুজুর্গগণ যখনই জুতা পরতেন (সেলিমশাহি) নাগড়া জুতা পরতেন। হাফেজ মুহাম্মদ আহমদ দারুল উলুম দেওবন্দের মুহতামিম ছিলেন। তিনি হজরত কারি মুহাম্মদ তাইয়্যেব (রহ.) এর পিতা ছিলেন। সেসময় ভারত বর্ষে ইংরেজদের শাসন চলছিল। বৃটেনের পক্ষ থেকে এখানে শাসক নিয়োগ দান করা হত। তাকে ভাইসরয় বলা হত। তৎকালীন ভাইসরয় হাফেজ মুহাম্মদ আহমদ (রহ.)-কে সরকার সম্মানসূচক শামসুল উলামা খেতাব দিয়েছিল। একবার সেই ভাইসরয় সাক্ষাত দানের জন্য হজরতকে দিল্লিতে ডেকে পাঠায়। দেশের শাসক তাকে সসম্মানে আহ্বান করেছে তাই তিনি সাক্ষাতের জন্য তাশরিফ নিয়ে যান। তিনি যখন মহলে প্রবেশ করতে যান তখন দারোয়ান ভদ্রলোক তাকে বাধা দিয়ে বলে, এ জুতা পরে আপনি ভেতরে যেতে পারবেন না। তখন তিনি পাটের রশি দ্বারা তৈরি অতি সাধারণ জুতা পরেছিলেন। বর্তমানে সেলিমশাহি নাগড়া জুতা তো খুবই সূক্ষ্ম  এবং দামী হয়ে থাকে। কিন্তু সে যুগের পাটের রশি দ্বারা তৈরি অতি সাধারণ জুতা খুব মোটা হতো। যাহোক, সে বলল, আপনি এ জুতা পরে ভাইসরয়ের সঙ্গে দেখা করতে যেতে পারবেন না। আপনাকে বুট জুতা পরে যেতে হবে।

আমার সাক্ষাতের প্রয়োজন নেই: হজরত মাওলানা হাফেজ মুহাম্মদ আহমদ (রহ.) বললেন যে, আমি নিজে তো ভাইসরয়ের সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য আবেদন করিনি। তাই আমার সাক্ষাত করার কোনো প্রয়োজন নেই। তিনিই আমাকে ডেকে পাঠিয়েছেন। এখন তিনি যদি সাক্ষাতের জন্য এ শর্ত আরোপ করেন যে, আমার নিজের পছন্দের জুতা খুলে তার পছন্দের জুতা পরবো, তা হলে তার সঙ্গে সাক্ষাতের এ দাওয়াত কবুল করছি না। আমি অপারগ। আর যদি সে আমার পছন্দের পোশাকে আমার সঙ্গে সাক্ষাত দিতে প্রস্তুত থাকে, তা হলে আমি তৈরি আছি। আমার এ কথা তাকে জানিয়ে দাও। সে সাক্ষাত দিতে না চাইলে আমি ফিরে যাচ্ছি। এ কথা বলে তিনি ঘুরে দাঁড়ালেন। 
এবার তো দারোয়ানের সব ভদ্রলোকী উধাও হয়ে গেল। সে ভাবলো যে, ভাইসরয় যখন এ কথা জানতে পারবে যে, মাওলানা সাহেব এসেছিলেন এবং এ কারণে ফিরে গেছেন, তা হলে তো আমার খবর হয়ে যাবে। তাই সে ভেতরে গিয়ে জানালো যে, অমুক মাওলানা সাহেব তো এ কথা বলছে। ভাইসরয়ও শুনে অসন্তুষ্ট হলো যে, তুমি মাওলানার সঙ্গে একি আচরণ করেছ। তাড়াতাড়ি তাকে ভেতরে ডেকে আনো। তখন তাকে সঙ্গে সঙ্গে ভেতরে ডেকে নিল।

তিনি এমন জুতা কেন পরেছেন? হজরতমাওলানার এমন জুতা পরার প্রতি গুরুত্বারোপ করার কারণ এটা ছিল না যে, এরূপ জুতা পরা সুন্নত। তাই কেউ যেন এমন আপত্তি উত্থাপন না করে যে, এমন জুতা পরা কী কোনো ওয়াজিব-ফরজ ছিল? তিনি যদি ওই সময় ওই জুতা পরে যেতেন তা হলে তো হারাম বা গুনাহ হতো না। কিন্তু তিনি দুই কারণে এমন জুতা পরার প্রতি গুরুত্বারোপ করেছেন। একটি কারণ তো এই ছিল যে, তিনি নিজের উসতাদ, আলেম, নেককার ও বুজুর্গগণকে এমন জুতা পরতে দেখেছেন। তাই তিনি তাদের মত বেশ ধারণ করতে চেয়েছেন। দ্বিতীয় কারণ এই ছিল যে, বিষয়টি আত্মমর্যাদা ও গাম্ভীর্যের পরিপন্থী ছিল যে, একদিকে তো আলেম ব্যক্তিকে ডাকা হচ্ছে, অপরদিকে নিজের পছন্দের পোশাক ও জুতা পরার শর্তারোপ করা হচ্ছে। এ বিষয়টি আত্মমর্যাদার পরিপন্থী ছিল। বিধায় হজরত এটা মেনে নেননি।

গুরুত্বারোপ করা কী বেদআত? এখন কেউ কেউ এ পর্যন্ত বলে যে, তোমরা যে এ ব্যাপারে গুরুত্বারোপ কর যে, পোশাক এমন হতে হবে, জামা এমন হতে হবে, পায়জামা এমন হতে হবে, টুপি এমন হতে হবে, এভাবে গুরুত্বারোপ করা বেদআত। কারণ হাদিস দ্বারা এমন পোশাক, এমন জুতা, এমন টুপি প্রমাণিত নয়। অথচ তোমরা এগুলোর প্রতি সুন্নত ওয়াজিবের মত গুরুত্বারোপ করছ। ফলে এটা, التزام ما لم يلزم (এমন বিষয়কে আবশ্যকীয় মনে করা যেটা শরিয়ত আবশ্যকীয় করেনি) হলো বেদআত।

প্রিয়জনের সাদৃশ্য: এ কথা ঠিক নয়। কারণ এ পোশাক, এ জুতা এবং এ টুপিকে সুন্নত বা ওয়াজিব মনে করে গুরুত্বারোপ করা হয় না। বরং এগুলোর প্রতি এ কারণে গুরুত্বারোপ করা হয় যে, এগুলো আমাদের বুজুর্গ, আমাদের উসতাদ এবং আমাদের মাশায়েখের অনুসৃত পদ্ধতি। আমরা তাদের পদ্ধতি অবলম্বন করলে, তাদের বেশ ধারণ করার বরকতে আল্লাহ তায়ালা আমাদের স্বভাব চরিত্রও তাদের মত বানিয়ে দেবেন।

تیرے  محبوب  کی یا   رب  شباہت  لیکر  آیا  ہوں
حقیقت   اس  کو  تو  کر  دے میں  صورت  لیکر  آیا  ہوں

হে আল্লাহ! তোমার প্রিয়জনের সাদৃশ্য গ্রহণ করে এসেছি। আমি তাদের সুরত নিয়ে এসেছি, আপনি একে হাকিকত বানিয়ে দিন।

বুজুর্গগণের পোশাক পরার দ্বারা তাদের সাদৃশ্য অবলম্বন হয়ে থাকে। 

অনাবশ্যক বিষয়কে আবশ্যক মনে করা বেদআত: অপর দিকে কিছু মানুষ বাস্তবিকই মনে করে যে, এমন বেশ ধারণ করা এবং এমন পোশাক পরিধান করা ফরজ, ওয়াজিব বা কমপক্ষে সুন্নতে মুয়াক্কাদা তো অবশ্যই। এ পোশাক এবং এই বেশ থেকে কেউ বিমুখ থাকলে তার ওপর আপত্তি করা হয়। তাকে এ বলে তিরষ্কার করা হয় যে, সে এমন পোশাক কেন পরে না? এভাবে গুরুত্বারোপ করা এবং আবশ্যক বানিয়ে নেয়া এ বেশ এবং পোশাককে বাস্তবিকই বেদআত বানিয়ে দেয়। যেমন, এ নিয়ে আপত্তি করা হয় যে, অমুক পাঁচ কল্লি টুপি কেন পরেনি? অমুক এ ধরনের জুতা কেন পরেনি? অমুক এমন ধরনের পোশাক কেন পরেনি? যখন এমন ধরনের পোশাক এবং বেশ ধারণ না করার কারণে ফরজ ওয়াজিব তরক করার মত আপত্তি করা হবে, তখন এ পোশাক এবং এ বেশ বেদআত হয়ে যাবে। আমাদের মত লোকদের মধ্যে অনেক সময় এমন কথা হয়ে থাকে।

আসল কথা তো শুরু হয়েছিল এখান থেকে যে, আল্লাহওয়ালাদের পোশাক ধারণ করো। এতে বরকত রয়েছে। কিন্তু পরবর্তীতে এ পোশাককে এমন গুরুত্ব দেয়া হয় যে, তা ফরজ ওয়াজিবের স্তরে চলে যায়। ফলে এ পোশাক বেদআত হয়ে যায়। এটি অতি মারাত্মক ব্যাপার। চলবে...

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএজে

Best Electronics
Best Electronics