Alexa অপচয় থেকে বাঁচার উপায় (পর্ব-২)

ঢাকা, শনিবার   ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৯,   আশ্বিন ৭ ১৪২৬,   ২২ মুহররম ১৪৪১

Akash

অপচয় থেকে বাঁচার উপায় (পর্ব-২)

মাওলানা ওমর ফারুক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ২০:০৭ ১৭ জুলাই ২০১৯   আপডেট: ২০:১১ ১৭ জুলাই ২০১৯

ফাইল ফটো

ফাইল ফটো

অপচয় কৃপণতার বিপরীত জিনিস। কৃপণতার অর্থ হলো, যেখানে খরচ করা উচিত সেখানে খরচ না করা। আর অপচয়ের অর্থ হলো, যেখানে খরচ না করা উচিত সেখানে খরচ করা। এ উভয়টি নাজায়েজ ও নিষিদ্ধ। 

প্রথম পর্বের পর থেকে-

অবৈধ উপকারের জন্য ব্যয় করা: যখন আল্লাহ তায়ালার দেয়া ছোট ছোট নেয়ামতের কদর করি এবং তার জন্য শোকর আদায় করি, তখন আল্লাহ তায়ালা আরো অধিক দান করবেন। আর যদি না-কদরি ও নাশোকরি কর, তা হলে আজাবের এবং ওই নেয়ামত ছিনিয়ে নেয়ার আশঙ্কা রয়েছে। যাহোক, পয়সা হারিয়ে যাওয়ার পর খোঁজ না করা এবং উপকার ছাড়া ব্যয় করা, পয়সা এমনিতেই নষ্ট করার দৃষ্টান্ত। আর যেখানে ব্যয় করার পেছনে উপকার তো আছে, কিন্তু সে উপকার শরিয়তসম্মত নয়, তার দৃষ্টান্ত হলো প্রদর্শনীর জন্য ব্যয় করা। শরিয়তে তা জায়েজ নেই। বা পয়সা ব্যয় করে এমন কোনো স্বাদ উপভোগ করা হলো, যা জায়েজ নেই। এতে ব্যয় করার উপকার তো আছে, কিন্তু তা অবৈধ উপকার। তাই তা অপচয়ের অন্তর্ভুক্ত।

আরো দেখুন>>> অপচয় থেকে বাঁচার উপায় (পর্ব-১)

অপচয় ও অপব্যয়ের পার্থক্য: আলেমগণ বলেন যে, ইসরাফ বা অপচয় হলো ব্যাপক অর্থবোধক। আর তাবযির বা অপব্যয় হলো বিশেষ অর্থবোধক। তাবযির শুধু অবৈধ ক্ষেত্রে ব্যয় করলে হয়। অর্থাৎ, নাজায়েজ কাজে পয়সা ব্যয় করা হলো তাবযির বা অপব্যয়। যেমন, ফিল্ম দেখে, জুয়া খেলে টাকা ব্যয় করলে, তা হলে এটি হলো তাবযির বা অপব্যয়। আর এ সমস্ত অপব্যয়ও ইসরাফ তথা অপচয়ের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত। তবে যেখানে নাজায়েজ এবং হারাম কাজে পয়সা ব্যয় হচ্ছে না, তবে অনর্থক কাজে ব্যয় হচ্ছে, সেটা ইসরাফ তথা অপচয় তো হবে, কিন্তু তাবযির বা অপব্যয় হবে না। যাহোক, ইসরাফের মধ্যে যেহেতু তাবযিরও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, এ জন্য আমি ইসরাফের সংজ্ঞা এই দিয়েছি যে, এমন জায়গায় টাকা ব্যয় করা, যেখানে উপকার নেই। বা উপকার আছে কিন্তু তা নাজায়েজ উপকার।

ব্যয় না করায় ক্ষতি না হলে ব্যয় না করা: হজরত থানবি (রহ.) বলেন যে, ব্যয় করার পূর্বে দেখো, ব্যয় না করলে ক্ষতি আছে কী না। যদি ব্যয় না করার মধ্যে কোনো ক্ষতি না থাকে, তা হলে ব্যয় করো না। যদিও এর মধ্যে ব্যয় করার জায়েজ সুরতও বের হবে। যেমন, ব্যয় করার মধ্যে তো ক্ষতি নেই, কিন্তু ব্যয় করলে উপকার আছে। এখানে ক্ষতি না হওয়া এবং উপকার হওয়া উভয়টি পাওয়া গেল। আর এমন ক্ষেত্রে ব্যয় করা জায়েজ। কিন্তু হজরত থানবি (রহ.) তরবিয়তের উদ্দেশ্যে হুকুম দেন যে, তোমার জন্য নির্দেশ হলো, ব্যয় না করার মধ্যে যদি ক্ষতি না থাকে তা হলে ব্যয় করবে না। যদিও সেই বিশেষ ক্ষেত্রে ব্যয় করা মৌলিকভাবে জায়েজ হোক না কেন।

আরো দেখুন>>> ‘মাদিনা’ হজে জন্ম নেয়া প্রথম শিশু

ব্যয় করার পূর্বে মুরুব্বির সঙ্গে পরামর্শ করা: শুধু এতটুকু বলেই তিনি ক্ষান্ত হননি। বরং আরো বলেছেন যে, যদি ক্ষতি হবে মনে হয় তা হলে কোনো মুরুব্বির সঙ্গে পরামর্শ করো। অর্থাৎ, ব্যয় করার সময় এ কথা চিন্তা করো যে, যদি ব্যয় না করি তা হলে কোনো ক্ষতি আছে কী না। চিন্তা করে দেখা গেল যে, এ ক্ষেত্রে ব্যয় না করলে ক্ষতি হবে। তা হলে এমতাবস্থায়ও ব্যয় করার পূর্বে কোনো মুরুব্বির সঙ্গে পরামর্শ করো। তাকে জিজ্ঞাসা করো যে, এ ব্যয় অসঙ্গত ও অসমীচীন নয় তো? তারপর তিনি যা বলেন তার ওপর আমল করো। তুমি নিজে নিজের মত ফয়সালা করো না।

এ চিকিৎসা সবার জন্য নয়: তবে এ চিকিৎসা সবার জন্য নয় যে, সবাই ব্যয় করার পূর্বে এ কথা চিন্তা করবে যে, ব্যয় না করার মধ্যে ক্ষতি আছে কী না। যদি জানা যায় যে, ব্যয় না করলে ক্ষতি আছে, তবু ব্যয় করার পূর্বে মুরুব্বির সঙ্গে পরামর্শ করবে এবং তারপর ব্যয় করবে। এ চিকিৎসা সব মানুষের জন্য নয়। বরং যে ব্যক্তি প্রয়োজনের অতিরিক্ত অপচয়ে লিপ্ত, তার জন্য হজরত থানবি (রহ.) এ ব্যবস্থাপত্র নির্ধারণ করেছেন।

মালফুজে হজরত থানবি (রহ.) বলেন, অপচয় সম্পর্কে বলছি যে, যখন কোনো জিনিস ক্রয় করতে চাও, তখন চিন্তা করে দেখ যে, এর প্রয়োজন আছে কী না। যদি অবিলম্বে প্রয়োজনের কথা মনে পড়ে তা হলে তা ক্রয় করো। আর যদি অবিলম্বে প্রয়োজনের কথা মনে না পড়ে, তা হলে ক্রয় করো না। কারণ যে প্রয়োজনকে আধা ঘণ্টা ধরে চিন্তা করে করে সৃষ্টি করতে হয়, তা প্রয়োজন নয়। আর যদি অন্তরে খুব চাহিদা হয়, আর উল্লেখযোগ্য প্রয়োজনের কথা মনে না পড়ে, তা হলে এমতাবস্থায় জিনিসটি ক্রয় করো এরপর ধীরে সুস্থে চিন্তা করতে থাক। যদি অপচয় না হওয়া নিশিচত হও তা হলে খাও। অন্যথায় দান করে দাও। (আনফাসে ইসা ১৯১)।

অর্থাৎ, কোনো কোনো জিনিসের প্রয়োজনীয়তা যদি সঙ্গে সঙ্গে বুঝে আসে, তা হলে তো ঠিক আছে, তা ক্রয় করো। কিন্তু আধা ঘণ্টা ধরে চিন্তা করার পর যদি তার ব্যয়ের ক্ষেত্র বুঝে আসে তা হলে প্রকৃতপক্ষে তা প্রয়োজনীয় নয়।

একটি জিনিস কিনতে খুব মন চাচ্ছে, তখন চিন্তা করল যে, এর প্রয়োজন আছে কী না? কিন্তু চিন্তা করার পরও তার প্রয়োজন বুঝে আসল না। এ সম্পর্কে বলেন যে, ওই জিনিস ক্রয় করো। তারপর ধীরে সুস্থে বসে চিন্তা করতে থাক। যদি অপচয় না হওয়া সুনিশ্চিত হয় তা হলে খেয়ে ফেল। অন্যথায় দান করে দাও। কারণ ওই সময় যদি ক্রয় না কর, তা হলে সুযোগ হাতছাড়া হয়ে যাবে। তাই উপস্থিত সময়ে ক্রয় করো। তবে পরবর্তীতে চিন্তা করে দেখ যে, প্রয়োজনীয় জিনিস ক্রয় করছ না অপ্রয়োজনীয়। চিন্তা করার পর যদি জানা যায় যে, এর প্রয়োজন রয়েছে, তা হলে তা ব্যবহার করো। আর যদি প্রয়োজন না থাকে তা হলে তা দান করে দাও।

স্ত্রী-সন্তানকে খুশি করার জন্য ব্যয় করা: এরপর একই মালফুজে হজরত থানবি (রহ.) বলেন, স্ত্রীকে খাওয়ানোও দান করার অন্তর্ভুক্ত। স্ত্রীকে খুশি করার জন্য যদি বিনা প্রয়োজনেও কোনো জিনিস ক্রয় কর, তা হলে সেটাও অপচয় নয়। কারণ স্ত্রীর মনতুষ্টিও কাক্সিক্ষত বিষয়। তবে শর্ত হলো, এ জন্য সামর্থ্যের অধিক ঋণ না করতে হবে। (আনফাসে ইসা)।

অর্থাৎ, স্ত্রীর মন খুশি করার জন্য বিনা প্রয়োজনে কোনো জিনিস ক্রয় করাও অপচয় নয়। স্ত্রীর সঙ্গে সন্তানও অন্তর্ভুক্ত। এটা কেন? তার কারণ তিনি বর্ণনা করেছেন যে, স্ত্রীর মনকে খুশি করাও কাক্সিক্ষত বস্তু। মূল কথা এটাই যা পূর্বে বলেছি যে, ব্যয় করার পেছনে কোনো ফায়দা থাকতে হবে। কিন্তু এটা জরুরি নয় যে, নিজেরই ফায়দা হতে হবে। অন্যের ফায়দাও এর অন্তর্ভুক্ত। কারণ অন্যের মনকে খুশি করা এবং অন্যের মনোরঞ্জন করাও ফায়দার অন্তর্ভুক্ত। সে মনোরঞ্জন স্ত্রীর হোক, সন্তানের হোক, মা-বাবার হোক, ভাই-বোনের হোক, তাও একটি উল্লেখযোগ্য ফায়দা। এর পেছনে যা কিছু ব্যয় করা হবে, তাও অপচয় নয়।

উসতাদ সামনে ৫২ প্রকারের খাবার: হজরত থানবি (রহ.) এর নিকট একবার তার উসতাদ হজরত শায়খুল হিন্দ (রহ.) তাশরিফ আনেন। হজরত থানবি (রহ.) তার উসতাদের সম্মানে বায়ান্ন প্রকারের খানা তৈরি করান। হজরত শায়খুল হিন্দ মাহমুদ হাসান (রহ.) যখন দস্তরখানে বায়ান্ন প্রকারের খাবার দেখলেন, তখন বললেন যে, ভাই, তুমি এটা কী করেছ? হজরত থানবি (রহ.) বললেন, সত্য কথা হলো এখনো আমার মন ভরেনি। মন তো চাচ্ছিল আরো তৈরি করাই।

এখন অন্য মানুষ তো এই বায়ান্ন প্রকারের খাবার দেখে বলবে, এটা তো অপচয় হয়েছে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এখানে উসতাদের সম্মান উদ্দেশ্য ছিল। আর এটাও জানা ছিল যে, কোনো জিনিসই নষ্ট হবে না। বরং যা বাঁচবে তা অবশ্যই আল্লাহ তায়ালার কোনো বান্দার কাজে আসবে। আল্লাহ না করুন, যদি নষ্ট হতো তা হলে অবশ্যই তা অপচয় হতো। কিন্তু সেখানে তো এটা নিশ্চিত ছিল যে এর কিছুই নষ্ট হবে না। আর কোনো প্রকারের প্রদর্শনীও সেখানে ছিল না যে, মানুষকে দেখানোর জন্য এই বায়ান্ন প্রকারের খাবার তৈরি করেছেন। বরং নিজের মনের দাবিতে এবং উসতাদের খেদমত ও উসতাদের সম্মানের উদ্দেশ্যে এগুলো তৈরি করিয়েছিলেন। তাই এতে কোনো অপচয় ছিল না।

নিয়তের ব্যবধানে গুনাহ ও সওয়াব: এ কাজটিই কোনো মানুষ যদি এ নিয়তে করে যে, ইতিহাসে রেকর্ড হয়ে থাকবে যে, অসুক ব্যক্তি এমন দাওয়াত করেছিল, তাতে বায়ান্ন প্রকারের খাবার ছিল। তখন এ কাজটিই অপচয়ও হবে এবং হারামও হবে। একইভাবে বিবাহ-শাদিতে উপহার-উপঢৌকন দেয়া হয়। এ উপহার যদি আন্তরিক মহব্বতের কারণে দেয় যে, এ ব্যক্তি আমার নিকটাত্মীয়। তার খেদমত করতে মন চায়। কিছু দিয়ে মনের আনন্দ প্রকাশ করতে ইচ্ছা হয়। তা হলে এটি সুন্নত আমল এবং এতে বিরাট সাওয়াব ও প্রতিদান রয়েছে। তখন এটি বরকতের জিনিস। আর এ কাজটিই যদি এ নিয়তে করে যে, এ উপহার দেয়াতে নাম হবে যে, অমুক ব্যক্তি বিবাহে এ উপহার দিয়েছে, তখন এ জিনিসই অপচয় ও গুনাহর কারণ হবে। আল্লাহ তায়ালা আপন অনুগ্রহে কার্পণ্য থেকেও আমাদেরকে হেফাজত করুন এবং অপচয় থেকেও হেফাজত করুন। আমিন। চলবে...

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএজে