Alexa অনন্ত কুয়ার জলে চাঁদ

ঢাকা, শনিবার   ১৯ অক্টোবর ২০১৯,   কার্তিক ৩ ১৪২৬,   ১৯ সফর ১৪৪১

Akash

অনন্ত কুয়ার জলে চাঁদ

মোহাম্মদ আসাদুল্লাহ ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৯:৩১ ১ অক্টোবর ২০১৯   আপডেট: ২২:২৪ ১ অক্টোবর ২০১৯

ছবি: ইন্টারনেট

ছবি: ইন্টারনেট

(১)
আমাদের শিশুকালে ইঁদারা ও কুয়া ছিলো প্রায় একমাত্র সুপেয় জলের উৎস। ইঁদারাগুলো স্থাপিত হত সরকারিভাবে অথবা জমিদারদের পৃষ্ঠপোষকতায়। আর কুয়াগুলো ছিলো বংশের বা পারিবারিক সম্পত্তি। দুই ধরণের কুয়া ছিলো। ইট-সিমেন্টের তৈরি এক প্রকার, কুমোরদের তৈরি পোড়া মাটির গোলাকৃতি ফ্রেম দিয়ে আরেক প্রকার। পরিবার বা শরীকের অর্থনৈতিক অবস্থান অনুসারে কুয়াগুলোর ধরণ হত ভিন্ন। ইঁদারাগুলো তৈরি করা হতো ইট, সুড়কি আর সিমেন্ট দিয়ে। স্থাপন করা হতো সাধারণত স্কুল, মসজিদ, মাদরাসা, বাজার, সরাইখানা ইত্যাদি সামাজিক মিলনস্থলের সন্নিকটবর্তী স্থান সমূহে।

আমার বয়স তখন দশ/বার। আমাদের ঝাড়কাটা স্কুল ও স্কুল মসজিদের মধ্যবর্তী স্থানে একটাই মাত্র ইঁদারা ছিল। মসজিদের ঠিক উত্তর–পূর্ব কোণে। বহুদিন যাবত অব্যবহৃত ও পরিত্যাক্ত থাকার কারণে সেটার ভেতরটা ছিলো অন্ধকারাচ্ছন্ন ও ভুতুড়ে। দিনের বেলাতেও প্রায়ান্ধকার থাকতো। জল ছিলো। তবে তলানির দিকে। ইঁদারার ভেতর থেকে সর্বক্ষণ মাছের মতো আঁশটে গন্ধ ভেসে আসতো। প্রতিনিয়ত সেই গন্ধ স্কুলের মাঠ হয়ে সারা এলাকায় ছড়িয়ে পড়ত।

প্রতিটা বাড়িতেই এক বা একাধিক কুয়া ছিলো। খুব গরীবদের বাড়ি ছাড়া। তারা সরকারি ইঁদারা অথবা অন্যদের কুয়া থেকে পান করার জল সংগ্রহ করতো। স্নান করত ও কাপড়চোপড় ধুত পুকুর অথবা পগারের জলে। ছোটবেলায় আমি সাধারণত কুয়ার জলেই স্নান করতাম। কুয়ার পাশে পুতে রাখা একটা বাঁশের আগায় স্থাপন করা হয়েছিলো কপিকল। কপিকলের সঙ্গে যুক্ত ছিলো অন্য একটা লম্বা বাঁশ। পূর্বের বাঁশের সঙ্গে সমকোণে বা পৃথিবীপৃষ্ঠের সমান্তরালে স্থাপিত। এই বাঁশের দুইপ্রান্তেই ছিল দড়ি। কুয়ার দিকের প্রান্তের দড়ির আগায় বালতি বাঁধা। অপর প্রান্তের দড়ি দিয়ে বালতির চলাচলকে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। এই দড়িকে হালকাভাবে ছেড়ে দিলে বালতি কুয়ার ভেতরে ঢুকে যাবে। জলের নিকটে। আবার টান দিয়ে নীচে নামালেই অপর প্রান্তের জল ভর্তি বালতি কুয়ার ভেতর থেকে ওপরে উঠে আসবে।

আমরা বড় হতে হতেই এক সময়ে এই ইঁদারা বা কুয়া দুটোরই ব্যবহার উঠে গিয়েছিলো। কারণ সেগুলো রাতারাতি প্রতিস্থাপিত হয়েছিলো কাস্ট আয়রনের তৈরি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র নলকূপ এবং স্যালো মেশিনের সেচযন্ত্র দিয়ে। এটা সত্তর দশকের কথা। দেশে তখন চলছিলো ইরি ধানের সবুজ বিপ্লব। আমার আজকের গল্পের সময়কাল এর অব্যবহিত পরে।

ইঁদারাটিকে দূর থেকে দেখতে বাঁশের তৈরি ধানের গোলার মতো লাগতো। এর দেয়ালের গায়ের সিমেন্টগুলো একটু একটু করে খসে গিয়েছিলো। বয়সের ভারে। দেয়ালের স্থানে স্থানে ছিলো বড় বড় গর্ত। ইট উধাও হয়ে যাবার কারণে। এই গর্তগুলোতে পায়ের আঙুল ঢুকিয়ে যে কোন শিশুও সিঁড়ির মতো বেয়ে ইঁদারার প্রাচীরের ওপরে উঠতে সক্ষম ছিলো।

ইঁদারার প্রাচীরের উপরিভাগ ছিলো এক থেকে দেড় ফুট প্রশস্ত। স্কুল মাঠে গরু চরানো একটা রাখাল বালক সারা দিনমান এই প্রাচীরের ওপরে শুয়ে থাকত। মনের দুঃখে বাঁশি বাজাতো। মনের দুঃখে বলছি এ কারণে যে, মাত্র দুই বছর পূর্বে যখন তার বয়স ৫ বছর, তখন তার পিতামাতা দুজনেই মৃত্যুবরণ করেছিলো ১৯৭৪ সনে। অভাবের তাড়ণায়। ক্ষুধার জ্বালায়। দেশব্যাপী বিশাল এক দুর্ভিক্ষের সময়ে।

বালক আমাদের পেছনের বাড়ির পরামানিকদের গরু চরাতো। বিনিময়ে তাকে শুধুই দুই বেলার খাবার দেয়া হতো। দুপুরে আর রাতে। ইঁদারার প্রাচীরের ওপরে তার চিৎ হয়ে শুয়ে থাকার দৃশ্যটা এতো যুগ পরেও আমার স্পষ্ট মনে আছে। কারণ, তার শরীরটা ছিলো হাড়জিরজিরে। পেট ভর্তি কৃমি। পেটের সামনের অংশ ফূটবলের মতো গোলাকার ও বিশালাকার। প্রাচীরের ওপরে যখন সে চিৎ হয়ে শুয়ে থাকতো, তখন কয়েক শত গজ দূর থেকেও তার অর্ধ গোলাকৃতি পেটটাকে মনে হতো একাদশীর চাঁদের মতো। ইঁদারার ভেতর থেকে অর্ধেক ভেসে উঠেছে। হয়তোবা ডুবে যাবে একটু পরেই।

ইঁদারা থেকে কয়েক ফুট দূরে ছিলো একটা বটগাছ। শতবর্ষী। ইঁদারার চেয়েও অনেক পুরোনো। এর কাণ্ড থেকে অজস্র শিকড় অজগর সাপের মতো শূন্য থেকে ঝুলতো। এদের মধ্যে দুই তিনটা শিকড় ঝুলতে ঝুলতে ঢুকে গিয়েছিলো ইঁদারার ভেতরে। ছেলেটা এই শিকড়গুলো ধরে ইদারার ভেতরে পাঁচ ফুট নীচে শুন্যের ভেতরে ঝুলতে পারতো। টারজানের মতো। এতেই সে আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হয়ে উঠেছিলো। অসম সাহসিকতার জন্যে।

ইঁদারার ভেতরে ছিল অন্য জগত। দেয়ালের সিমেন্ট এবং ইটগুলো খুলে খুলে অবলুপ্ত হয়েছিলো। ফলে দেয়ালের গায়ে তৈরী হয়েছিলো অজস্র গর্ত। মাছরাঙার বাসস্থানের মতো। এই গর্তগুলোর ভেতর থেকে মাথা উঁচু করে সুর্যের মুখ দেখার চেষ্টা করতো ট্রি ফার্ণের দল। এরা ভেতরের দেয়ালকে সবুজে আচ্ছাদিত করে রেখেছিলো। কার্পেটের মতো। বড় হবার পর স্কুলে পড়ার সময়ে আমি জেনেছি যে, এই ফার্ন বর্তমান সময়ের নয়। প্রাগৈতিহাসিক আমলের। প্রায় ২০ কোটি বছর আগে ট্রি ফার্নই উদ্ভিদ জগতের প্রধান প্রতিনিধি ছিলো। অঙ্গার যুগের (carboniferous age) কয়লা স্তরগুলি মূলত তাদেরই সৃষ্টি।

প্রতি পূর্ণিমার রাতে চাঁদের আলো বট গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে ইঁদারার জলের ওপরে পড়তো। ঠিক আলো নয়। আলোছায়ার খেলা। ইঁদারার জলে তখন এক অলৌকিক দৃশ্যের অবতারণা হতো। ইঁদারার আলকাতরার মতো কালো জল তখন রুপার মতো চিকচিক করতো। এই সময়েই জলের নিচে একটা ছায়াশরীর অবিরত চক্কর দিতে থাকতো। কিছুক্ষণ পর পর স্থির জলের ভেতরে ঘুর্ণির সৃষ্টি করতো। অন্য সময়ে এর অস্তিত্বই বোঝা যেতো না। গ্রামের প্রবীণরা দাবি করতেন ওটা দেও বা দৈত্য। খননের পর থেকেই ওটা ইঁদারার পাহারাদার হিসেবে কাজ করতো। যারা অপেক্ষকৃত আধুনিক মনস্ক তারা বলতেন ওটা বিশালাকার এক গজার মাছ।

আমার আকর্ষণ অবশ্য এসব কিছুতে ছিলো না। আমার বিশ্বাস ছিলো ইঁদারার জলের ভেতরে ডুবসাঁতার দিয়ে পৃথিবীর কেন্দ্রে পৌঁছা সম্ভব। সেখান থেকে পৃথিবীর অন্য প্রান্তে। পৃথিবীর অন্য প্রান্তের একটা প্রতিচ্ছবিও আমার মনের ভেতরে আঁকা হয়ে গিয়েছিলো।

 (২)
“When did my youth slip away from me? I suddenly thought. It was over, wasn't it? Seemed just like yesterday I was still only half grown up.” ― Haruki Murakami
আমি আপনাদেরকে এক অতিসাধারণ এক শৈশবের কথা শোনাবো। সেই রাখাল বালকের এবং কিছুটা আমার।

বালকের নাম মুলা! হালকা গন্ধবিশিষ্ট, সাদা রঙের 'মূল' জাতীয় সবজির নামে নাম। আপনার মতো আমিও প্রথমবার শোনার পর ভীষণ রকম বিস্মিত হয়েছিলাম। মানুষের নাম এমন অদ্ভুত হয় কী করে?

অবশ্য বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমার ভেতর থেকে এই অবাক হবার ব্যাপারটা চলে গিয়েছিলো। কারণ আমি আরো কয়েকটা অদ্ভুত নামের সঙ্গে পরিচিত হয়েছিলাম। তাদের একটা ছিলো ‘কই’। কই মাছের নাম থেকে নেয়া। আমাদের পেছনের বাড়ির তিরিশ উর্ধব এক প্রাণবন্ত যুবকের নাম। এই নামের উৎস সম্পর্কে জানতে গিয়ে সত্যিই অবাক হয়েছিলাম। কইয়ের মা ছিলেন মৃতবৎসা। সাং বছর তিনি সন্তান জন্ম দিতেন। কিন্তু তারা কেউই পৃথিবীর আলোতে চোখ খুলতো না। কইয়ের জন্মের পূর্বে তিনি পর পর পাঁচটি মৃত সন্তান প্রসব করেছিলেন। কোন প্রার্থনা, কবিরাজের তুকতাক অথবা ধাত্রীর দক্ষতাই গ্রীক ট্র্যাজেডির মতো অমোঘ এই নিয়তিকে পরিবর্তন করতে সক্ষম ছিলো না। আধুনিক চিকিৎসা তখনো আমাদের এলাকায় আসেনি। আসতে হয়তো আরো কয়েক দশক লেগে যাবে। ফলে শেষ চেষ্টা হিসেবে বালকের পিতা মায়ের পেটে থাকাকালেই তার নাম রেখেছিলেন ‘কই’। অসাধারণ প্রাণশক্তির অধিকারী কাদামাটি ও জলজ মাছের নামে। উদ্দেশ্য যম যাতে তাকে সহজে হত্যা করতে সক্ষম না হয়। তার উদ্দেশ্য সার্থক হয়েছিলো। যমও তার জগতে আগমনকে আটকাতে সক্ষম হয়নি। আমার জানামতে কই তার চার কুড়ির অধিক বছর বয়সেও সহিসালামতেই জীবনযাপন করছেন। আমরা ছোটবেলায় ডাকতাম কই ভাই বলে।

শুধুমাত্র উদ্ভিদ বা প্রাণীজাত নয়। কয়েকটা পোস্ট-মডার্ন নামও ছিলো আমাদের এলাকায়। তিন সহোদরের। স্ক্রু, নাট ও বল্টু। সম্ভবত ইন্ডাস্ট্রিয়াল যুগ বা রেভ্যুলুশনের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিলো এই নামগুলো। তাদের জন্ম হয়েছিলো দেওয়ানগঞ্জ চিনির মিল যে সময়ে স্থাপিত হয় সেই সময়ে। আমরা যখন শিশু তখন তারা তিন ভাইই ছিলেন যুবক অথবা তার চেয়েও অধিক বয়স্ক। আমার নানাবাড়িতে অর্থাৎ সুখনগরী গ্রামে আমি তাদেরকে দেখেছি। অসাধারণ কৌতুকপূর্ণ আচরণের অধিকারী ছিলেন তিন জনেই। নাম মানুষের ব্যক্তিত্ব ও আচরণের ওপরেও প্রভাব ফেলে।

বালকের মুলা নাম গ্রহণের ইতিহাসটা পূর্বেরগুলো থেকে একটু ভিন্নধরনের। জন্মের সময়ে তাকে কি নাম দেয়া হয়েছিলো সেটা আমার জানা নেই। তবে মূলার বাপের নামটাও ছিলো অদ্ভুত। অক্ক। আমরা ডাকতাম অক্ক ভাই বলে। আমাদের বাড়িতে দিনমজুরের কাজ করতেন। সম্ভবত ‘অক্কা পাওয়া’ বাগধারা থেকে তার নামটা গৃহীত হয়েছিলো। অবধারিত মৃত্যু থেকে তাকে রক্ষা করার জন্যে। অথবা অন্য কিছু। তবে ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের সময়ে তিনি সত্যিই অক্কা পেয়েছিলেন। ক্ষুধার তাড়নায়। মৃত্যুকালে তিনি মুলার মা, মূলা এবং তার ছোটবোনকে রেখে গিয়েছিলেন। মুলার মা স্বামীর মৃত্যুর কয়েক মাস পরেও কোলের কন্যাকে নিয়ে অন্যত্র চলে গিয়েছিলেন। হয়তোবা বিবাহ করে। আর কোনোদিন ফিরে আসেননি। শুধু রয়ে গিয়েছিলো মুলা আমাদের এলাকায়। দুর্ভিক্ষ পরবর্তী সময়ে তাকে আশ্রয় দেয়ারও কেউ ছিলো না। প্রাথমিক পর্যায়ে ক্ষুধার তাড়নায় মুলা লিভ অফ দ্য ল্যান্ড (Live Off the Land) শুরু করে। আমাদের বাড়ি থেকে মাত্র পঞ্চাশ গজ দূরে ছিল মুলাদের কূড়েঘর। শতছিন্ন। কবি জসিম উদ্দিনের আসমানিদের বাড়ির মতো। হাল্কা বাতাসের ধাক্কায় বাঁশের তইর পাতলা চাটাইয়ের দরজা খুলে যায়। এমন নিরাপদ! মুলাদের ঘরের কাছেই একটা বিশাল বরই গাছ। সারাদিন টুপ টুপ করে ওপর থেকে বরই পড়ে। বৃষ্টির ফোটার মতো। বরই গাছ থেকে একটু দূরেই আমাদের চান চাচাদের সবজীর ক্ষেত। এখানে মিষ্টি আলু, গোল আলু, মূলা ধরণের সবজী ফলে। তবে মুলার বিশেষ পছন্দ ছিলো মূলা। এই ক্ষেতের মূলা সে প্রায় একাই খেয়ে সাবাড় করে দিয়েছিলো। জীবন ধারণের তাগিদে। ফলে তার নাম হয়ে গিয়েছিলো মূলা। এটাই তার নামের সানে- নযুল!

মূলার সঙ্গে আমার পরিচয় তার জন্মের পরেই। তবে বিশেষ সখ্য ১৯৭৫ সালে। আমি তখন ঝাড় কাটা প্রাইমারি স্কুলে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ি। মূলা প্রতিদিন সকালে আমাদের অন্দর বাড়ির ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে থাকে। উচ্ছিষ্ট খাবারের আশায়। সকাল থেকে সন্ধ্যা অবধি। ক্ষেতের মুলা তখন শেষ। আমরা ভাইবোনেরা তাকে নিরাশ করি না। আমাদের সকালের নাস্তা থেকে ছিড়ে রুটি, দুপুরে উচ্ছিষ্ট ভাতের সঙ্গে তরকারির ঝোল অথবা রাতে অনাহার প্রতিনিয়তই তার ভাগ্যে জুটতো। আসলে আমাদের ঘরের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকাটা তার অভ্যাসে পরিণত হয়ে গিয়েছিলো। খাবার দিলেও দাঁড়াতো। না দিলেও দাঁড়াত। অবশ্য বছরখানেকের বেশি সময় মুলা পরনির্ভরশীল ছিলো না। আমাদের পেছনের বাড়ির গফুর পরামানিক তার গরু চড়ানোর জন্যে তাকে নিয়ে গিয়েছিলেন। দুপুর এবং রাতের খাবারের বিনিময়ে। ঝাড়কাটা স্কুল মাঠে পরামানিকদের বাড়ির গরু প্রতিপালন করাই মুলার প্রথম পেশা। এর বাইরে তার একটা নেশা ছিলো। মার্বেল গুটি খেলা। এটাকে জুড়েই ছিলো তার প্রতিভা। আমার সঙ্গেও তার সখ্য এখানেই। যদিও আমি কখনোই মার্বেল খেলিনি। মার্বেল খেলার অনুমতি আমার ছিলো না। বাল্যকাল থেকেই আমি ছিলাম নিতান্তই ভদ্র, শান্ত ও দুধ-ভাত প্রকৃতির। তবে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মার্বেল খেলা দেখতাম। কাঁচের তৈরি মার্বেলগুলোর ভেতরে অদ্ভুত সুন্দর কিছু নকশা ছিলো। রঙবেরঙের। আমাকে এই নকশাগুলো ভিন্ন এক পৃথিবীতে নিয়ে যেতো। ভিন্ন কোনো রঙিন পৃথিবীতে। যে পৃথিবীতে আমার কখনোই যাওয়া হয়নি।

আমাদের বাড়ি থেকে ৩০০ গজ উত্তরে একটা পরিত্যাক্ত ভিটা। নাম কামারের ভিটা। এই ভিটা নিয়ে আমি অন্যত্রও বলেছি। ভিটার পশ্চিম কোণে একটা প্রায়ান্ধকার বাঁশঝাড়, কয়েকটা উঁচু উঁচু করই গাছ (শিরীষ গাছ), তিনটা শিমুল গাছ, একটা মান্দার গাছ, দুটো পরিত্যাক্ত ঘরের ভিটে, একটা কামারের দোকানের পরিত্যাক্ত ভিটে, একটা মান্দার ফুলের গাছ আর অসংখ্য গুল্মে ভর্তি ঝোপঝাড় এবং একটা এঁটেল মাটির মসৃণ উঠোন নিয়ে এই ভিটা। এটা ছিলো মুলার মার্বেল গুটি খেলার উৎকৃষ্টতম স্থান।

উঠোনটা বিস্তৃত ছিলো বাঁশঝাড়ের নিচ পর্যন্ত। বৃষ্টির জল এই উঠোন দিয়ে প্রবাহিত হবার কারণে এর মাঝ বরাবর একটা স্থান কিছুটা নিচু হয়ে অসাধারণ একটা মার্বেল খেলার মাঠ তৈরি করেছিলো। মসৃণ। একদিকটা উঁচু। অন্যদিকটা ক্রমাগত নিচু হয়ে আবার উঁচু হয়ে গিয়েছিলো। ফলে মার্বেলগুলোকে আলতোকরে ছেড়ে দিলেও জলের মতো গড়িয়ে গড়িয়ে তারা মাধ্যাকর্ষণের টানে একটা গর্তের ভেতরে হুমড়ি খেয়ে পড়তো। অবশিষ্ট মার্বেলগুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকতো আকাশের ভেতরের নক্ষত্রদের মতো। মুলার প্রতিভা ও দক্ষতা ছিলো প্রায় ৭ ফুট দূরত্ব থেকে একটা বড় মার্বেল দিয়ে আঘাত করে এক এক করে মার্বেলগুলো নিজের অধিকারে নিয়ে আসা। নির্ভুল তার লক্ষ্যভেদ। মহাভারতের অর্জুনের লক্ষ্যভেদের মতো। এলাকার কোন ছেলেই মুলার সঙ্গে পেরে উঠতো না। দিনশেষে তার অবস্থাটা ছিলো দেখার মতো। মূলার কোঁচড় ভর্তি মার্বেল। গোধূলির আলোতে তার মুখ। অনির্বচনীয় আনন্দে ভরপুর।

আমরা কেউই জানি না মুলা তার প্রতিদিনের সংগ্রহকরা এই মার্বেলগুলো কোথায় লুকিয়ে রাখতো। তবে আমাকে সে প্রায়ই তার জিতে নেয়া মার্বেল গুলোর ভেতরের সবচেয়ে বড় মার্বেলটি দিতো। ভালবেসে।

(৩)
ইঁদারা সম্পর্কে আরো কিছু কথা। সংস্কৃত ইন্দ্রাগার থেকে ইঁদারা শব্দের উৎপত্তি। মূলত ইন্দ্র ও আগার এই দুই শব্দের সন্ধি। ইন্দ্র অর্থ বৃহৎ। আগার অর্থ পাত্র। অর্থাৎ বৃহৎ পাত্র বা কূপ। প্রাচীন কাল থেকেই উপমহাদেশে ইঁদারার প্রচলন ছিলো। আমাদের এলাকায় সত্তর দশকেও ইঁদারার ব্যবহার ছিলো। নলকূপ প্রচলনের পূর্ব পর্যন্ত। তবে বাড়িতে বাড়িতে কুয়ার ব্যবহার প্রচলিত ছিলো আরো কিছুকাল। নব্বই দশকের প্রথম বা মাঝামাঝি পর্যন্ত।

আমাদের বাড়িতে আমার বয়সী কোনো ছেলে শিশু ছিলো না। ফলে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাইপো বলাইয়ের মতো এক নির্জন বালক হিসেবে আমি বেড়ে উঠছিলাম। আমাদের বাড়ির পেছনে বিশাল বাঁশঝাড়ের বন। কয়েক একর জায়গা জুড়ে। এর উত্তর পাশ দিয়ে একটা মাটির রাস্তা আমাদের বাড়ি থেকে ঝাড় কাটা স্কুল মাঠের প্রান্ত পর্যন্ত পৌঁছেছে। মাত্র দুই শত গজ দীর্ঘ। কিন্তু আমার কাছে মনে হতো কয়েক ক্রোশ। সারা দিনমান এই বাঁশবনের ভেতরে প্রায়ান্ধকার বিরাজ করে। সন্ধ্যার মতো। একটু বাতাস হলেই বাঁশ গাছের কাণ্ডগুলো পরস্পরের সঙ্গে ঘষা লেগে ক্যাচ ক্যাচ শব্দ করতে থাকে। অনবরত। আমার কাছে মনে হয় অপার্থিব কোনো শব্দ। অন্য পৃথিবীর। ‘ইটি’ ছবির সেই মহাজাগতিক মিউজিকের মতো। বাঁশবনের শেষপ্রান্তে স্কুল মাঠের কাছে দুইটা গাব গাছ। গাছের পাতাগুলো গাঢ় সবুজ।পুরো গাছ জুড়ে অন্ধকার। বড়দের কাছ থেকে শুনেছি গাছে দুটো ভূত আছে। একটা আমার সমান লম্বা। অন্যটা মুলার সাইজের। সন্ধ্যার পর এরা গাছের শীর্ষ থেকে দিগন্তের ওপরে শরীর বের করে পৃথিবীকে অবলোকন করে থাকে। আমার কয়েকজন বড় ভাই স্কুল মসজিদের সামনের ইঁদারার প্রাচীরের ওপরে দাঁড়িয়ে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেছে এবং কেউ কেউ ক্ষেত্রে সফলও হয়েছে। রাস্তার পাশের বাঁশঝাড়গুলো ধনুকের মত নুয়ে এসে রাস্তার অপর পাশের পগারের জলে পতিত হয়েছে। পূর্ণিমার রাতে চাঁদের আলো বাঁশঝাড়ের ভেতর দিয়ে রাস্তার ওপরে পড়ে এক মায়াবী ও ভৌতিক পরিবেশের সৃষ্টি করে।

আমি কখনোই এই রাস্তাটুকু হেঁটে পার হতাম না। দিন বা রাত যখনই হোক না কেন। এই রাস্তার যে কোনো প্রান্তে দাঁড়ালেই একটা প্রবল ভয়ে আমি আক্রান্ত হতাম। অতঃপর সমস্ত সাহস সঞ্চয় করে চোখ ও নিঃশ্বাস বন্ধ করে দৌড় দিতাম। এই পথ অতিক্রম করার পুরো সময়টাতেই আমি টের পেতাম কেউ একজন দ্রুতলয়ে আমাকে অনুসরণ করছে। কিন্তু আমার গতির সঙ্গে পেরে উঠছে না।

বাঁশ বাগানের পশ্চিম পাশ দিয়ে একটা রাস্তা দক্ষিণে চলে গেছে। বাঁশ বনের শেষ প্রান্তে দুইভাগ হয়ে গেছে। একভাগ পূর্বদিকে প্রবাহিত হয়ে আমাদের গ্রামের পূর্ব প্রান্তে পৌঁছেছে। আমাদের গ্রামের উত্তর দিক দিয়ে। তালুকদার বাড়ির পাশে। ঝাড়কাটা নদী হতে একটা রাস্তা এসে এখানে এই রাস্তার সঙ্গে মিলিত হয়ে ঘুঘুমারী, বিনোদটঙ্গী, মাথাভাঙা ও আম্রিতলার মধ্য দিয়ে বালিজুরি হাটে পৌঁছেছে। অন্য রাস্তাটা স্কুল মাঠের কোণা থেকে সরাসরি বাঁশ বনের পশ্চিম দিয়ে গোদা শিমুলিয়া গ্রামের মধ্য দিয়ে, ফাজিলপুর তরফদার বাড়ির পাশ দিয়ে চরনগর হয়ে বালিজুরিতে পৌঁছেছে। এই রাস্তাটা খুবই ধূলিধূসরিত। মূলত এটা ফসলের ক্ষেত ও বালির চরের ভেতর দিয়ে চলে গেছে এই রাস্তা। সংক্ষিপ্ত বলে এই পথ দিয়েই আমরা বালিজুরি হয়ে সুখনগরী যাই। সুখনগরী হলো খরকা বিলের দক্ষিণ তীরে পূর্ব-পশ্চিমে প্রসারিত একটা গ্রাম। পুরো গ্রামটাই বনের মতো। অন্ধকারাচ্ছন্ন। এই গ্রামের এক বাড়িতে রাতের বেলায় জিনপরী হাজির করানো হয়। ছেলেবেলায় একবার আমি সেখানে হাজির ছিলাম। রাতের বেলায় অন্ধকারের ভেতরে ঘর ভর্তি মানুষের সঙ্গে আমি এক কবিরাজ জীনের নাকি সুরের কথা শুনে আমি ভীত সন্ত্রস্ত হয়েছিলাম। খরকা বিলের জলের নীচ দিয়ে চলাফেরা করতো একটা দেও। উল্টানো কয়ড়ার মতো দেখতে। প্রতি পূর্ণিমার রাতে খরকা বিলের কেন্দ্রে এটাকে দেখা যেতো।

আসলে ভয়ের কারণেই আমি মুলার সঙ্গে সখ্য গড়ে তুলেছিলাম। সে ছিলো অসমসাহসী। তবে কথা বলতো কম। কদাচিৎ কথা বলে। বেশিরভাগ ভাবই প্রকাশ করে আকারে-ইঙ্গিতে। পশ্চিমের রাস্তার ধারে একটা শিমূল গাছ। প্রতি ফাল্গুনে রক্তবর্ণ ধারণ করে। আমার উচ্চতা থেকে দুই উচ্চতা উঁচুতে গাছের কোটরে একটা গভীর গর্ত। কাঠঠোকরা পাখিরা বানিয়েছে। অথবা গাছের বাঁকল পচে গিয়ে তৈরি হয়েছে। এর ভেতরে একটা টিয়ে পাখির বাসা। আমার খুব সখ টিয়ে পাখি পালন করার। আমি নিশ্চিত যে, মা টিয়ের চেয়ে অধিক মায়া দিয়ে আমি বাচ্চাগুলোকে পালতে সক্ষম। মুলাকে বলতেই সে আমাকে জানালো, ‘ভাইজান, বাচ্চাগুলোকে আনতে হলে চোখ ফোটার আগেই পেড়ে আনতে হবে। মাকে চিনে গেলে আর কখনোই পোষ মানবে না।’ মূলার ভাবখানা এই যে জন্মের পরপরই তার বাবা-মা গত হবার কারণে তার একাকী থাকতে কষ্ট হয় না। একবার অভ্যাস হয়ে গেলে আর একাকী থাকতে পারতো না। মুলার প্রত্যক্ষ সহায়তায় পিতা-মাতার অনুপস্থিতিতে আমি চোখ না ফোটা একটা শিশু টিয়ে পাখিকে নিয়ে এসেছিলাম এবং প্রবল মাতৃত্ববোধ (!) দিয়ে তাকে প্রতিপালন করেছিলাম।

উড়তে শেখার পর আমি তাকে অনুমতি দিয়েছিলাম স্বজাতির সংগে মিশতে। প্রতিদিন সকালে টিয়ের ব্রেকফাস্টের পর এক ঝাঁক টিয়ে আমাদের রান্না ঘরের ছনের চালে এসে বসতো। আমি আমার টিয়েকে ছেড়ে দিতেই তারা দলবেঁধে উত্তরের দিকে চলে যেতো। ঝাড়াকাটা গ্রাম, ঝাড়কাটা নদী, মাহমুদপুর, মেলান্দহ বাজার, জামালপুর, শেরপুর, নালিতাবাড়ি, শ্রীবর্দি হয়ে গারো পাহাড় পেরিয়ে আরো উত্তরে। ফিরে আসতো সন্ধ্যার পূর্বে। সবগুলো টিয়ে এসে পুনরায় বসতো আমাদের রান্নাঘরের চালে। আমি একটা কাঁসার বাটিতে চামচ দিয়ে টুংটাং আওয়াজ করতেই টিয়েটা এসে বসতো আমার কাঁধে। অন্যগুলো নিজেদের নীড়ে ফিরে যেতো। এটাই ছিলো প্রাত্যহিক।

তবে টিয়ে প্রতিপালনের শেষটা ছিলো বেদনাবিধুর। শ্রাবণ মাসের শেষ সময়। সকালে টিয়ের দল চলে যাবার পর শুরু হলো মুষলধারে বৃষ্টি। সারাদিন অবিশ্রান্ত বর্ষণ। রাতের বেলাতেও। আমি অস্থির হয়ে আছি টিয়ের জন্যে। পড়াশুনা সব চুলোয় গেছে। পরদিন থেকে শুরু হলো জাপকা বৃষ্টি। সাতদিন ধরে অবিরাম। এক সপ্তাহকাল ধরে টিয়েদের দেখা নেই। সাতদিন পর দুপুরের পর আকাশ পুনরায় পরিষ্কার। নীল আকাশের ভেতরে পেঁজা তুলোর মতো সাদা সাদা মেঘ। শরৎ কাল সমাগত। গোধূলির কিছু পূর্বে টিয়ের দল ফিরে এসেছে। আমাদের রান্না ঘরের চালে। আমি মহা-আনন্দিত। যথারীতি আমি কাঁসার বাঁটি দিয়ে ঘন্টা বাজালাম। টিয়েরা কিছুক্ষণ নিজেদের ভেতরে মুখ চাওয়া-চাওয়ি করলো। কিন্তু আমার টিয়ে আমার কাঁধে নেমে এলো না। এক সময়ে গোধূলির আলো নিভে যেতেই সবগুলো দলবেঁধে প্রস্থান করলো। আর কখনোই প্রত্যাবর্তন না করার জন্যে!


(৪)
“একদিন জলতলে
বিদ্যুৎ-গতির আলোড়নে...
সহসা কখনো তার
ভয়ঙ্কর শেষ দেখা পাবো---
চলে যাবো, অন্ধকার মুখের ভিতরে চলে যাবো!
” - - শম্ভুনাথ চট্টোপাধ্যায়

গ্রামের ছেলেবেলাটা অদ্ভূত রকমের যাদুময় ও স্বাধীন হলেও কম ভীতিকর ও বিপদসংকুল ছিলো না। বাঁশবন পেরিয়ে স্কুলের মাঠের কোণা। এখানে পৌঁছুতে পারলেই যে আমি বিপদমুক্ত হয়ে যেতাম তা নয়। এই সময়ে আমাদের বাড়ির আর পরামানিকদের বাড়ির কুকুরগুলো গগনবিদারী চিৎকার করতে করতে দুই বিপরীত দিক থেকে তেড়ে আসতো। পরস্পরের দিকে। মাঝখানে আমি। ভয়ে আমার আত্মারাম খাঁচা। প্রাণভয়ে আমি ইঁদারার দিকে দৌড়াতে থাকতাম। প্রাণপণে। এক সময়ে কুকুরগুলো আমাকে ছেড়ে নিজেদের মধ্যে কলহে লিপ্ত হতো। আমি ইঁদারার কাছে পৌঁছে যেতাম। হাঁপাতে হাঁপাতে।

ইঁদারার প্রাচীরের ওপরে মুলা তার সকল নৈর্ব্যক্তিকতা নিয়ে কাত হয়ে শুয়ে ছিলো। দৃষ্টি ইঁদারার ভেতরে। স্থির অন্ধকারাচ্ছন্ন জলের দিকে। হয়তোবা জলের নিচের ছায়া শরীর অথবা জগতকে পর্যবেক্ষণ করার চেষ্টা করছিলো। আমাকে দেখে উঠে বসলো। বললো, ‘ভাইজান, কুত্তারে ভয় পাইলে চলবো না। ভয় পাইলেই কামড় দিয়া দিবো। আফনে বাম হাতের কানি আঙুলের নখে কামড় দিয়া দাঁড়াইয়া থাহলেই হেরা এক পাওও আগাইবার সামুস (সাহস) পাইবো না। সুড়সুড় কইরা চইল্যা যাইবো।’ পরের দিন সকাল। একই দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি। দুই দিক থেকে এগিয়ে আসছে দুই পাল কুকুর। সব মিলে ১০-১৫টা। আমি প্রাণপণে দাঁড়িয়ে যেয়ে চোখ বন্ধ করে বাম হাতের কনিষ্ঠা আঙুলে কামড় দিলাম। আমার দাঁত ক্রমশ গেঁথে যাচ্ছে আঙুলের চামড়ার ভেতরে। কিন্তু কুকুরগুলো তখনো এগিয়ে আসছে। ভয়ের কারণে আমি আঙুলে কোনো ব্যাথাই অনুভব করছি না। অতঃপর ভীষণ অবাক করা কাণ্ড! কুকুরগুলো আমার পাঁচ গজের ভেতরে এসে থেমে গেলো। পরস্পরের দিকে মুখ চাওয়াচাওয়ি করলো কিছুক্ষণ। পুনরায় ঘেউ ঘেউ করতে করতে নিজ নিজ বাড়িতে ফিরে গেলো। আমি মুলার প্রতি ভীষণ কৃতজ্ঞ।

অগ্রাহায়ন মাস। মাঠে মাঠে ধান কাটা সারা। আমন ধানের বিচালিতে ভরে আছে। সমস্ত প্রান্তর বিবর্ণ, ধূসর। সকালের দিকে প্রান্তরের স্থানে স্থানে কুয়াশা জমে থাকে। দূর থেকে ছেড়া ছেড়া মেঘের মতো লাগে। প্রান্তরের ওপারে উত্তরের ঝাড় কাটা গ্রামকে অস্পষ্ট মনে হয়। আমাদের এলাকায় তখন ছেলেধরার উপদ্রব চলছে। প্রায় বছরের এই সময়েই এই ভীতিকর উপদ্রব কোত্থেকে আবির্ভাব হয়। দিন সাতেক পূর্বে ঝাড় কাটা স্কুলের পশ্চিম পাশের নিশ্চিন্তপুর গ্রামের এক ছেলে উধাও হয়ে গেছে। সুবহে সাদেকের পর সে বংশীপাড়ার রাস্তা দিয়ে সে যমুনা পাড়ের গোবিন্দি চরের দিকে যাচ্ছিলো। কলাইয়ের ক্ষেতে। একা একা। পথিমধ্যে ছেলেধরা তাকে নিয়ে চলে গেছে। যমুনার ওপর দিয়ে। কয়েকজন জেলে নাকি এক বিকট চেহারার প্রাণীকে তাকে নিয়ে আকাশ পথে যমুনা অতিক্রম করতে দেখেছে। ঘন কুয়াশার মতো মেঘের ভেতর দিয়ে। আমরা যারা শিশু তাদের জন্যে সবচেয়ে ভয়ের ব্যাপার হলো ছেলেধরা কোন মাটির রাস্তা অনুসরণ করে আসে না। তার পায়ের রবারের স্যান্ডেলের নীচে স্প্রিং আছে। চাইলেই সে এর সাহায্য নিয়ে শুন্যের ভেতরে ব্যাঙের মতো লাফ দিতে দিতে সে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় চলাফেরা করতে পারে। ঘরের চালের ওপর দিয়ে লাফ দিয়ে অন্দরমহলের উঠোনে অবতরণ করতে পারে। কাজেই আমরা শিশুরা কোথাও নিরাপদ নই। রাস্তার ওপরে, একাকী মাঠে অথবা বাড়ির উঠোন থেকে মুহূর্তের ভেতরে আমরা অপহৃত হয়ে যেতে পারি। বাবা-মা, পাড়া-পড়শী কেউই টের পাবে না। যখন টের পাবে তখন পার্থিব জগতের বাইরে আমরা কোথাও। ভীষণ আতঙ্কের ভেতরে আমি দিনাতিপাত করি।

আমাদের বাড়ির উঠোন থেকে গারো পাহাড়ের নীল রিজলাইন দেখা যায়। পাহাড়ের ওপারে আসাম নামে একটা মায়ার বা যাদুমন্ত্রের দেশ আছে। কিছুদিন পূর্বে আমাদের ঘরের আলমারিতে আমি ‘বশির’ নামের একটা বই খুঁজে পেয়েছি। বইটা সেই যাদুমন্ত্রের দেশ সম্পর্কে। উপন্যাস। বশির নামের এক বাঙালী কিশোর সেখানে হারিয়ে গেছে। ফিরে আসার পথ খুঁজে পাচ্ছে না। দুঃখজনক হলো বইটার অর্ধেক ছেড়া। তার পরিণতি সম্পর্কে আমি কিছুই জানতে পারছি না। আমি আতঙ্কিত মূলার জন্যে। সে রাতের বেলাতেও স্কুল ঘরের বারান্দাতে ঘুমায়। মূলা নির্বিকার। পার্থিব জগতের অনিত্যতা বা অনিশ্চয়তা তাকে বিন্দুমাত্র বিচলিত করে না।

নিরালম্ব দুপুর। আমার স্কুল ছুটি হয়ে যায় যোহর নামাজের অব্যবহিত পূর্বে। ক্লাস শেষ হলেই আমি ছুটে যাই ইঁদারার পাড়ে। এখানে বট গাছের তলে অদ্ভুত শীতল বাতাস প্রবাহিত হয়। মুলাকে নিয়ে ইঁদারার ভেতরে মুখমণ্ডল ঢুকিয়ে চিৎকার করি। কয়েক সেকেন্ড পর আমার ও মুলার চিৎকারের অনুরণন ফিরে আসে। ফিরে আসা শব্দ আমাদের নয়। অন্য জগতের শব্দ। মুলা ভয় পায় না। আমি কিছুটা ভয় পাই। কথা প্রসঙ্গে মুলা আমাকে জানায় যে, আর একটু বড় হলে সে ইঁদারার ভেতরের দেয়ালের খাঁদগুলোতে পা দিয়ে জলের ভেতরে নামবে। মসজিদের হুজুর প্রতিদিন ছেলেদের কাছ থেকে মার্বেল ছিনিয়ে নেন এবং ইঁদারার ভেতরে নিক্ষেপ করেন। এটা তার শখ এবং এক ধরণের নিষ্ঠুরতা। মহা আনন্দ পান তিনি এতে। শিশুদেরকে ধুলাবালির ভেতরের খেলাধুলা থেকে নিবৃত করার জন্যে তিনি এটা করে থাকেন। এর মাধ্যমে তিনি অতিরিক্ত পুণ্য অর্জনের চেষ্টাও হয়তোবা করে থাকেন। মার্বেলগুলো এক এক করে ইঁদারার জলে নিক্ষেপ করার সময়ে তার মুখমণ্ডল আলোকিত হয়ে ওঠে। অবশ্য তিনি কখনোই খেয়াল করেন না যে তার আনন্দিত আলোকিত মুখের সমান্তরালে ওই সময়ে শিশুদের মুখের চেহারা কেমন থাকে। মুলার খুব ইচ্ছে ইঁদারার তলায় জমা এই মার্বেল গুলো সংগ্রহ করে নিজের অধিকারে নিয়ে আসার। পৃথিবীতে একমাত্র মার্বেল নিয়েই তার দূর্বলতা রয়েছে!

অবশ্য মূলার কাছে ইঁদারার একটা ভিন্ন আকর্ষণ রয়েছে। ইঁদারাটিকে তার অন্য জগতের প্রবেশদ্বার বলে মনে হয়। মৃত্যু পরবর্তী জগত অথবা অন্য কোনো জগত। তার ধারণা ইঁদারার জলের নীচের জগতে তার মৃত পিতামাতা বসবাস করেন। শুধু তার পিতামাতা নয়। পৃথিবীর সকল মৃতরা সেখানে বসবাস করে। আমি একবার বোঝার চেষ্টা করেছিলাম তার এই ধরণের চিন্তার উৎস। আমাকে সে স্বপ্নের কথা বলেছে। স্বপ্নের ভেতরে সে নাকি ঘুরে এসেছে সেই জগত। অদ্ভুত সুন্দর জগত। প্রচুর খেলার সাথী। খাবারের অভাব নেই। সেখানে মৃত পিতাপাতার সঙ্গে তার দেখা হবে। সারাদিনমান ধরে বন্ধুদের সঙ্গে মার্বেল খেলবে। নিষেধ করার কেউ থাকবে না। পৃথিবীতে সে খুব একাকী। তার একান্ত ইচ্ছে একবার সেই জগতে প্রবেশ করার। তবে ভয় তার শুধুমাত্র জলের নীচের ঘূর্ণায়মান সেই ছায়াশরীরকে। তাকে অতিক্রম করে সেই জগতে পৌঁছানো তার পক্ষে আদৌ সম্ভব কিনা সে সম্পর্কে সে নিশ্চিত নয়।

কয়েক মাস পর। আমার বার্ষিক পরীক্ষা শেষ। নানাবাড়িতে বেড়াতে গিয়েছি। গ্রামের নাম সুখনগরী। খরকা বিলের পাশে। যমুনা থেকে মাত্র এক মাইল দূরে। এবার একটা অদ্ভুত কারণে আমার ভেতরের ভয় কমে গেছে। মামাতো ভাইদের নিয়ে গ্রামের পূর্ব পাশের গভীর বনের ভেতরে ঘোরাঘুরি করি। নৌকার পাটাতনের ওপর থেকে নিচু হয়ে হয়ে খরকা বিলের জলের নিচে সঞ্চরণশীল উপুড় করা কড়াইয়ের ছায়াশরীরকে গভীরভাবে খেয়াল করার চেষ্টা করি। আমার মামাতো ভাইরা আমার আচরণগত পরিবর্তন দেখে অবাক। সারা জীবন তারা আমাকে ভীতু বলে জেনে এসেছে।

দুই সপ্তাহ পর নানাবাড়ি থেকে নিজ বাড়িতে প্রত্যাবর্তন। এবার প্রথমবারের মতো আমি ধীরলয়ে আমাদের বাড়ির পশ্চিম পাশের বাঁশ বাগানের পাশের রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাই। স্কুল মাঠে প্রবেশ করি। আমার ভয় করে না। স্কুল মাঠ ভর্তি চোরাকাটা। এদের আগা কাশফুলের মতো সাদা। দূর থেকে মনে হয় মাঠের উচ্চতা এক ফুট বেড়ে গেছে। আমি ধীরপায়ে মাঠ অতিক্রম করে এগিয়ে যাই। দুই বাড়ির কুকুরের দল আমার পিছু লাগে না।

ইঁদারার পাশে আমি ভেবেছিলাম মুলাকে পাবো। কিন্তু অদ্ভুত কারণে সে সেখানে অনুপস্থিত। নির্জন দুপুর। যোহর নামাজের পর মসজিদের হুজুর সম্ভবত খাবার খেতে গেছেন। তিনি আমাদের বাড়ির দক্ষিণে অবস্থিত জুয়েলদের বাড়িতে জায়গীর থাকেন। প্রতি একমাস অন্তর অন্তর তার এই জায়গীরের স্থান পরিবর্তিত হয়। এক পরিবার থেকে অন্য পরিবারে। এক বাড়ি থেকে অন্য বাড়িতে। সারা বছর ঘুরে ঘুরে তিনি এই তিন বাড়ির সকল পরিবারেই লজিং থাকেন। এই তিন বাড়ির ছেলেমেয়েরাই স্কুল মসজিদে প্রতিদিন সকালে কায়দা, আমপারা আর কোরআন শরীফ পড়া শিখে। হুজুরের নিকট। এ কারণেই তিন বাড়ির সকল পরিবারের সন্তানদের তিনি অভিভাবকের মতো শাসন করে থাকেন। তাদের মার্বেল খেলা নিয়ন্ত্রণ করেন।

কিন্তু মুলা কোথাও নেই! মসজিদের দক্ষিণ পাশে ফরিদদের বাড়ি। সে আমার সঙ্গে সকালে মসজিদে কোরআন শরীফ পড়ে। ওদের বাড়িতে গেলাম। তাকে জিজ্ঞেস করলাম মুলার কথা।

সে যা বলল তার সারমর্ম নিম্নরুপঃ
সপ্তাহ খানেক পূর্বে মসজিদের পাশের স্কুল ঘরটির পাশের বালুর স্তূপের নিচ থেকে পরামানিক বাড়ির ছেলেরা মুলার লুকিয়ে রাখা মার্বেলগুলো উদ্ধার করে এবং মসজিদের হুজুরের কাছে তা হস্তান্তর করে। প্রায় দেড় কেজি পরিমাণ। হুজুর মহানন্দের সঙ্গে সেগুলো একটা একটা করে ইঁদারার জলে নিক্ষেপ করেছেন। মুলাও সেখানে উপস্থিত ছিলো। কিন্তু সে কিছুই বলেনি। এমনকি কান্নাকাটিও করেনি। কিন্তু তার পরদিন সকাল থেকে মুলাকে আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। ইঁদারার ভেতরে লোক নামানো হয়েছিলো। জলের খুব নিকট থেকে সে লাঠি দিয়ে অনুসন্ধান করে দেখেছে। আশেপাশের বাড়িঘর, গ্রামগুলো এমনকি বালিজুরি, মহিষবাথান, মাহমুদপুর, গোবিন্দির চর সব এলাকাতেই খোঁজ করা হয়েছে। কোথাও পাওয়া যায়নি।

মুলাকে আর কোনোদিনই পাওয়া যায়নি। কর্পুরের মতো সে আমাদের দৃষ্টিসীমার ভেতর থেকে অন্তর্হিত হয়ে গিয়েছিলো। আমি মাঝেমধ্যে ভাবতাম মুলা অন্য কোথাও যায়নি। মার্বেলগুলো ফিরে পাবার জন্যে এবং মৃত বাবা মায়ের সঙ্গে দেখা করার জন্যে সে ইঁদারার জলের নিচের জগতেই চলে গিয়েছিলো। কোন কারণে ফিরে আসতে পারেনি। অথবা ইচ্ছে করেই ফিরে আসেনি।
(সমাপ্ত)

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর