Alexa ওজুর যতো দোয়া ও আমল

ঢাকা, শুক্রবার   ১৩ ডিসেম্বর ২০১৯,   অগ্রহায়ণ ২৮ ১৪২৬,   ১৫ রবিউস সানি ১৪৪১

ওজুর যতো দোয়া ও আমল

নুসরাত জাহান ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৬:০৪ ২০ নভেম্বর ২০১৯   আপডেট: ২১:২৮ ২০ নভেম্বর ২০১৯

ফাইল ফটো

ফাইল ফটো

আল্লাহ তায়ালার সঙ্গে সম্পর্ক মজবুত ও সুদৃঢ় করার জন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উম্মতকে মাসনুন দোয়া শিক্ষা দিয়েছেন। সকাল থেকে সন্ধা পর্যন্ত মানুষ নানান পরিস্তিতির মুখোমুখি হয়, সকল অবস্থায় তিনি আলাদা আলাদা দোয়া শিক্ষা দিয়েছেন। 

এসব দোয়ার আমল জারি রাখো- সকালে ঘুম থেকে জেগে এই দোয়া পড়, ঘরের বাইরে যাওয়ার সময় এই দোয়া পড়, বাজার গিয়ে এই দোয়া পড়, টয়লেটে যাওয়ার সময় এই দোয়া পড়, ইত্যাদি ইত্যাদি।

ওজুর সময় পড়ার দোয়া:
ওজুর সময় নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে দোয়া পড়তেন তা হলো, 
اللهم اغفرلى ذنبى ووسع لى فى دارى وباركلى فى رزقى

‘আয় আল্লাহ আপনি আমার গুনাহ ক্ষমা করুন, আমার আবাস প্রশস্ত করে দিন, আমার রুজি রোজগারে বরকত দিন।’ (তিরমিযী, আহমদ, মুসান্নাফে ইবনে আবি শারবা ৫০/৬, তাবারানী৩৫৯/১৯ মাজমাউয যাওয়ায়েদ ৬২/১০, সুনানে কুবরা ২৪/৬, মুসনাদে আবু ইয়ালা ৮১/১৫, জামিউল উসূল মিন আহাদিসির রাসূল)।

কোনো রেওয়ায়েতে আছে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওজুর সময় নিজে দোয়াটি পড়তেন, তবে অধিকাংশ রেওয়ায়েতে ওজুর শেষেই বর্ণিত আছে।

اشهدان لااله الاالله واشهد ان محمدا عبده ورسوله

আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি আল্লাহ তায়ালা ছাড়া কোনো ইলাহ নেই, এবং আমি আরো সাক্ষ্য দিচ্ছ হজরত মোহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহ তায়ালার বান্দা ও রাসূল (মুসলিম, তিরমিযী, আবু দাউদ, ইবনে মাজাহ, আহমদ দারেমী)।

ওজুর পরের দোয়া:
ওজুর শেষে কোন দোয়া পড়বে? এ বাবদ নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে দু’টি দোয়া বর্নিত আছে, একটি হলো, 

اللهم اجعلنى من التوابين واجعلنى من المتطهرين

হে আল্লাহ! আমাকে তাওবাকারীদের অন্তরভূক্ত করুন, এবং আমাকে অন্তর ভুক্তকরুন উত্তম রূপে পবিত্রতা অর্জনকারীদের। (তিরমিযী)।

ইতোপূর্বে আমি বলেছিলাম, যে মানুষ যখন ওজু করে তখন সে তার জাহেরি পরিচ্ছন্নতার সঙ্গে সঙ্গে বাতেনি পবিত্রতাও অর্জন করে নেয়। বাতেনি পবিত্রতা হলো এই ওজুর ফলে তার অঙ্গ প্রতঙ্গে সংঘটিত সগিরা গুনাহ আল্লাাহ তায়ালা মাফ করে দেন। এক হাদিসে এসেছে, বান্দা যখন ওজু শেষ করে তখন সে তার সকল সগিরা গুনাহ থেকে পবিত্রতা লাভ করে, তবে তার কৃত কবিরাহ গুনাহসমূহ তার জিম্মায়ই থেকে যায়। এখন কবিরা গুনাহ থেকে পবিত্রতা হাসিলের উদ্দেশ্যে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উম্মতকে উল্লিখিত দোয়া শিক্ষা দিয়েছেন।
 
সগিরা গুনাহর সঙ্গে সঙ্গে কবিরা গুনাহ থেকেও মুক্তি লাভ:
উল্লিখিত দোয়ার দু’টি বাক্য রয়েছে, প্রথমটি হলো, আমাকে অধিক তাওবাকারীদের অন্তরভুক্ত করুন। এই বাক্যের দু’টি মর্ম হতে পারে, (এক) ওজুর মাধ্যমে তো সগিরা গুনাহ মাফ হয়ে গেছে, কেননা নেক আমল দ্বারা সগিরা গুনাহ মাফ হয়, কবিরা গুনাহ তাওবা ছাড়া মাফ হয় না, কারণ কবিরা গুনাহ থেকে নিষ্কৃতি পাওয়ার একটাই উপায় আর তা হলো তাওবা। তাই এখানে আল্লাহর রাসূল সাল্লাাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই দোয়া শিক্ষা দিয়েছেন। আর নেক আমল দ্বারা সগিরা গুনাহ তো মাফ হয়ে গেছে, কিন্তু বহু কবিরা গুনাই এখন বাকি রয়ে গেছে, তা থেকে নিষ্কৃতির জন্য বলবে ‘হে আল্লাহ, আপনি আমাকে তাওবা করার তাওফিক দিন, যাতে এই তাওফিক পেয়ে আমি তাওবা করতে পারি এবং আমার সকল কবিরা গুনা মাফ হয়ে যায়।’

আমাকে বারবার তাওবা করার তাওফিক দিন:
উক্ত বাক্যের দ্বিতীয় মর্ম হলো, এই যে, এখানে একথা বলা হয়নি যে, আমাকে তাওবা করার তাওফিক দিন, বরং বলা হয়েছে, আমাকে সে সকল লোকের অন্তর্ভুক্ত করুন, যারা বেশি বেশি তাওবা করে। এখন প্রশ্ন হলো, এখানে অধিক্যসূচক শব্দ ব্যবহার করা হলো কেন, অথচ আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, যেই ব্যক্তি তাওবা করবে, আমি তাকে ক্ষমা করে দেব? এখানে বেশি বেশি তাওবা করার কী অর্থ? এর অর্থ হলো, আয় আল্লাহ আমি এখন তাওবা করছি জানি এর ফলে আপনি আমাকে মাফ করে দেবেন, কিন্তু এর পরও, আমি আমার পদস্খলিত হয়ে পড়ি কিনা এই আশঙ্কায় নিজের ওপর ভরসা রাখতে পারছি না। এমনটাই যদি হয়ে যায়, তা হলে আয় আল্লাহ আমকে পুনরায় তাওবা করার তাওফিক দেবেন।

মানুষের কাপড়চোপড় একবার ধুয়ে পরিষ্কার করার পর আবার ময়লাযুক্ত হয়ে পড়ে। এর পর তা আবার ধোয়ার প্রয়োজন দেখা দেয়। এমনিভাবে মানুষ তাওবার মাধ্যমে পরিষ্কার ও পবিত্র হয়ে যায়, পবিত্র হওয়ার পর পুনরায় গুনা হয়, লিপ্ত হয়ে পড়ে, ফলে সে নাপাক ও অপবিত্র হয়ে পড়ে, এরপর আবার তাওবা করার প্রয়োজন দেখা দেয়, এ কারণেই এই দোয়া করবে যে, আয় আল্লাহ প্রথম থেকেই আমাকে হেফাজত করুন, আমাকে পবিত্র রাখুন, এরপর গুনাহ হয়ে গেলে তাওবা করার তাওফিক দিন।

বার বার ফিরে আসার তাওফিক দিন:
উক্ত বাক্যের আরো একটি মর্ম রয়েছে, কারণ সেখানে তাওবা শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। যে ব্যক্তি বার বার ফিরে আসে, প্রত্যাবর্তন করে, তাকে আরবি ভাষায়া তাওবা বলা হয়। এটা তাওয়াব শব্দের আসল অর্থ। এখন উক্ত দোয়ার অর্থ দাঁড়াচ্ছে, হে আল্লাহ আমাকে সে সকল লোকের অন্তর্ভুক্ত করুন, যারা বার বার আপনার দিকে ধাবিত হয়, সব সময় আপনার দিকে ফিরে যায়, যারা সর্বদা আপনার সঙ্গে মজবুত ও সুদূর সম্পর্ক রাখে, যারা কোনো সমস্যার সম্মুখীন হলে, সঙ্গে সঙ্গে আপনার প্রতি মনোনিবেশ করে আমাকে তাদের দলভুক্ত করুন। ওজু শেষ করার সঙ্গে সঙ্গে এই দোয়া করবে, ওজুর সময়ও মাসনুন দোয়াগুলো পড়তে থাকবে। সবশেষে বলবে আয় আল্লাহ আমাকে বারবার আপনার দিকে আসার তাওফিক দিন যাতে সব সময় আপনার সঙ্গে সম্পর্ক সুদৃঢ় থাকে।

আমার বাতেনকেও পবিত্র করে দিন

উল্লিখিত দোয়ার দ্বিতীয় অংশ হলো, وجعلنى من المتطهرين

আয় আল্লাহ আমাকে এমন সব লোকের দলভুক্ত করুন, যারা যত্নের সঙ্গে পবিত্রতা অর্জন করে। তাহের মানে পবিত্র, আর মুতাহহির’ মানে যত্নের সঙ্গে উত্তমরূপে পবিত্রতা অর্জনকারী, অর্থাৎ যেই সব লোক বাহ্যিক পবিত্রতার সঙ্গে সঙ্গে অন্তরকেও পবিত্র করে। সুতরাং এর অর্থ দাঁড়াচ্ছে আয় আল্লাহ! ওজুর ফলে আমার অঙ্গসমূহ ধুয়ে ফেলেছি, বাহ্যিক ধুলা ময়লা দূর হয়ে গেছে, এখন আমার অন্তরের ময়লা দূর করে দিন। ওজুর পর পড়ার ব্যাপারে এই দোয়াটি রাসূল আকদাস সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত আছে।

ওজুর পরের আরেকটি দোয়া:
এ ব্যাপারে আরো একটি দোয়া বর্নিত আছে, নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওজুর পর এই দোয়াটি ও পড়তেন, سجا نك اللهم وبحمدك لااله الا انت وحدك لا سريك لك استغفرك واتوب اليك

আয় আল্লাহ, আমি আপনার পবিত্রতা বর্ননা করছি, এবং আপনার প্রশংসা করছি, আপনাকে ছাড়া কোনো মাবুদ নেই, আপনার কোনো অংশীদার নেই, আমি আপনার কাছে ক্ষমা চাচ্ছি, তাওবা করছি, (আবু দাউদ, মুসনাদে আহমদ)। 

এই দোয়ার শব্দমালায় প্রথমোক্ত দোয়ার পুনরাবৃত্তি ঘটেছে, অর্থাৎ সগিরা গুনাহ আপনার আপনি মাফ হয়ে গেছে, কিন্তু কবিরা গুনাহ থেকে নিষ্কিৃতির লক্ষ্যে তাওবা করা জরুরি, তাই রাসূল আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই দোয়া শিখিয়েছেন, استغفرك واتوب اليك

আয় আল্লাহ! আমি আপনার কাছে মাফ চাইছি, তাওবা করছি, এভাবে তাওবার মাধ্যমেও কবিরা গুনাহ থেকে ক্ষমা পাওয়া যাবে।

এবার চিন্তা করুন, যে সকল লোক প্রতি পাঁচবার ওজু করবে এবং ওজুর সময় সে সব দোয়া পড়বে, যা নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শিক্ষা দিয়েছেন এবং প্রত্যেকবার ওজুর পর এই দোয়া পড়বে,     اللهم اجعلنى من التوا بين و اجعلنى من المتطهرين

তারপর বলবে আয় আল্লাহ আমি আপনার কাছে ক্ষমা চাচ্ছি এবং তাওবা করছি, এর ফলে প্রতিদিন পাঁচবার আল্লাহ তায়ালার নিকট তার তাওবা ইসতিগফার করার তাওফিক হবে। আল্লাহ তায়ালা কি এমন ব্যক্তির তাওবা কবুল করবেন না? তার সঙ্গে এমন ব্যক্তিকে আল্লাহ তায়ালা সুদূর সম্পর্ক গড়ার তাওফিক দেবেন না? যে ব্যক্তি বলবে আয় আল্লাহ আপনি আমাকে আপনার প্রতি নিবিষ্ট চিত্ত বান্দা হিসেবে কবুল করুন, এবং আমাকে আপনার প্রতি ধাবিত বান্দা হওয়ার তাওফিক দিন। তাকে কি আল্লাহ তায়ালা মাহরুম ও বখিল রাতে পারেন? না, কখনোই এমনটি হওয়ার নয়, আল্লাহ তায়লা রাহমানুর রাহীম, অসিম দয়ালু, অতি মেহেরবান, তিনি আমাদের রব ও প্রতিপালক। কোনো সন্তান তার পিতা মাতার নিকট দৈনিক পাঁচ বার একই আবদার করতে থাকে তাহলে সে আবদার না রেখে তারা পারে না, এমন পিতাও কি আছেন যিনি সন্তানের আবদার আকুতি ফিরিয়ে দেবেন? না, পিতা সন্তানের বার বার করা আকুতি অবশ্যই মনজুর করবেন।

নিঃসন্দেহে আল্লাহ তায়ালা বাবা মায়ের চেয়ে বহু বহু গুণ বেশি স্নেহশীল ও আন্তরিক। কীভাবে তিনি তার বান্দাদের দোয়া প্রত্যাখ্যান করবেন? বরং অবশ্যই ইনশাআল্লাহ এই দোয়া কবুল হবে, ফলে আল্লাহ তায়ালা উক্ত বান্দাকে তার সঙ্গে মজবুত ও সুদৃঢ় সম্পর্ক গড়ার তাওফিক দেবেন, তাকে ভালবাসলে তার জীবন পবিত্র হয়ে উঠবে। যে সকল দোয়া নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত হয়েছে, আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে ওজু সম্পর্কীয় সে সবের ওপর আমল করার তাওফিক দান করুন, আমিন।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএজে