অজিদের উত্থানের ইতিহাস

ঢাকা, শুক্রবার   ২১ জুন ২০১৯,   আষাঢ় ৭ ১৪২৬,   ১৬ শাওয়াল ১৪৪০

তৃতীয় বিশ্বকাপ -১৯৮৭

অজিদের উত্থানের ইতিহাস

রুশাদ রাসেল ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ২৩:০০ ২২ মে ২০১৯   আপডেট: ২৩:০২ ২২ মে ২০১৯

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

ইংল্যান্ডে ’৮৩ বিশ্বকাপ যদি অঘটনের বিশ্বকাপ হয় তাহলে ’৮৭ বিশ্বকাপকে বলতে হবে অস্ট্রেলিয়ার উত্থানের বিশ্বকাপ। আগের তিনটি বিশ্বকাপ ইংল্যান্ডে হলেও এবারই প্রথমবার ইংল্যান্ডের বাইরে এবং এশিয়াতে বিশ্বকাপ আয়োজিত হয়। বিশ্ব ক্রিকেট তথা বিশ্ব রাজনীতিতে দুই পরাশক্তি ভারত ও পাকিস্তান যৌথভাবে আয়োজন করে এই বিশ্বকাপ। এবারের বিশ্বকাপে অনেক কিছুরই প্রথম দেখেছে বিশ্বের অগণিত মানুষ।

আগের তিন বিশ্বকাপে প্রত্যেক ইনিংসে ৬০ ওভার করে খেলা হলেও উপমহাদেশের এই বিশ্বকাপে প্রত্যেকটি দলকে করতে হবে ৫০ ওভার করে বোলিং। সেই থেকে এখন পর্যন্ত এটি বলবত রয়েছে। প্রথমবারের মত যৌথ আয়োজনের বিশ্বকাপও এটি। এছাড়া এই বিশ্বকাপেই প্রথমবারের মত সেমিফাইনাল তথা ফাইনালে খেলতে ব্যর্থ হয় ওয়েস্ট ইন্ডিজ। আশ্চর্যের ব্যাপার হলো এরপর আর কোন বিশ্বকাপেরই ফাইনাল খেলা হয়নি ওয়েস্ট ইন্ডিজের। তাছাড়াও, এই বিশ্বকাপেই প্রথমবারের মত বিশ্বকাপ হ্যাটট্রিক দেখেছিল বিশ্ব। ভারতের চেতন শর্মা নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে হ্যাটট্রিক করে এই কীর্তি অর্জন করেন। 

বিশ্বকাপের ফরম্যাটকে ’৮৩ বিশ্বকাপের মত রেখেই সাজানো হয় সূচি। শ্রীলংকা ততদিনে টেস্ট স্ট্যাটাস পাওয়া ৭টি টেস্ট খেলুড়ে দেশের সবাই মূলপর্বে খেলে। জিম্বাবুয়ে বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের মাধ্যমে সুযোগ করে নেয় এশিয়ায় হওয়া প্রথম বিশ্বকাপে। দুই গ্রুপে বিভক্ত হয়ে একে অপরের সঙ্গে মোট দুইবার মোকাবেলায় মোট ৬টি ম্যাচ খেলতে হয় একটি দলকে। ভারতের ২৪টি ও পাকিস্তানের ১০টি ভেন্যুতে বিশ্বকাপের ম্যাচগুলো আয়োজিত হয়েছিল। বিশ্বকাপে হওয়া ২৭টি ম্যাচে ভারত ১৭টি এবং পাকিস্তান ১০টি ম্যাচ আয়োজন করে। 

উপমহাদেশে বিশ্বকাপ হওয়ার পাশাপাশি তখনকার চ্যাম্পিয়ন ভারত হওয়ায় অনেকে সম্ভাব্য বিশ্বকাপ জয়ী হিসেবে ভারতের নামই সবার আগে উচ্চারণ করছিল। পাশাপাশি আরেক স্বাগতিক পাকিস্তানকেও সম্ভাব্য বিজয়ের কাতারে রেখেছিল। ওয়েস্ট ইন্ডিজ, অস্ট্রেলিয়া কিংবা ইংল্যান্ড তখনও উপমহাদেশে তেমন সুবিধা করতে পারত না বিধায় তাদেরকে কেউ ফেবারিটের তালিকাতেই রাখেনি। কিন্তু বিশ্বকাপ যে অঘটনের পসরা সাজিয়ে বসে সেটা বোধহয় ভুলে গিয়েছিল অনেকে। 

বিশ্বকাপের শুরুর ম্যাচ থেকেই উত্তেজনাপূর্ণ ও নেইলবাইটিং ম্যাচ উপহার দিতে থাকে দলগুলো। গ্রুপ ‘এ’ তে ভারতের সঙ্গে ছিল অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড ও জিম্বাবুয়ে। নিজের প্রথম ম্যাচেই ভারতকে অবিস্মরণীয়ভাবে মাত্র ১ রানে হারায় অস্ট্রেলিয়া। প্রথমে ব্যাট করে ২৭০ রান করে অস্ট্রেলিয়া। জিও মার্শের ১১০ রানে ভর করে অজিরা এই রান করতে সমর্থ হয়। অন্যদিকে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষেও কষ্টার্জিত জয় তুলে নেয় কিউইরা। মাত্র ৩ রানের ব্যবধানে তারা জয়লাভ করে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে। নিজেদের সবগুলো ম্যাচের ভেতর মাত্র ১টি ম্যাচ হেরে গ্রুপ পর্বের শীর্ষে ছিল অজিরা। কিন্তু লিগে নিজেদের শেষ ম্যাচে নিউজিল্যান্ডকে হারিয়ে শীর্ষ স্থান দখল করে সেমিতে ওঠে ভারত। শেষ ম্যাচে কিউইদের বিপক্ষে অসাধারণ এক জয় তুলে নেয় ভারত। এই ম্যাচে চেতন শর্মা বিশ্বকাপের প্রথম হ্যাটট্রিক করেন। 

সুনিল গাভাস্কার কিউইদের বিপক্ষে সেই ম্যাচে করেন ১০৩ রান। বিশ্বকাপে এটিই তার একমাত্র সেঞ্চুরি। চারটি বিশ্বকাপ খেললেও প্রথম বিশ্বকাপ থেকে সুনিলকে ১৭৪ বলে ৩৬* রানে অপরাজিত থাকায় এর জন্য অপবাদ পেতে হতো। ম্যাচ শেষে গাভাস্কার বলেছিলেন, ‘আমি ঘুমহীন একটি রাত কাটিয়েছি গতকাল। আমার প্রচণ্ড মাথা ব্যথা ছিল যেটা দিল্লি থেকেই বহন করে আসতেছি। আমার মনে হয়নি, আমার সেই রকম কোন দক্ষতা রয়েছে এই অবস্থায় খেলে যাওয়ার। এটা আমার জন্য অবিস্মরণীয় একটি দিন।’

অন্যদিকে গ্রুপ ‘বি’-তে স্বাগতিক পাকিস্তানের সঙ্গে ইংল্যান্ড, ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও শ্রীলংকা লড়াই করে। উদ্বোধনী ম্যাচে জাভেদ মিয়াদাদের সেঞ্চুরির কল্যাণে লঙ্কানদের বিপক্ষে জয় তুলে নেয় পাকিস্তান। এলান লাম্বের কল্যানে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে মাত্র ২ উইকেটের ক্লোজ একটি ম্যাচ জয় দিয়ে বিশ্বকাপ মিশন শুরু করে ইংল্যান্ড। নিজেদের দ্বিতীয় ম্যাচে আবদুল কাদিরের অসাধারণ লেগ স্পিনে ইংল্যান্ডকে ঘায়েল করে ১৮ রানের জয় তুলে নেয় পাকিস্তান। নিজেদের দ্বিতীয় ম্যাচে এসেই ট্রাকে ফিরে আসে ওয়েস্ট ইন্ডিজ। 

শ্রীলংকার বিপক্ষে ৩৬০ রানের পাহাড়সম রান জড়ো করে তারা। ডেসমন্ড হাইনস ১০৫ ও ভিভ রিচার্ডস ১২৫ বলে করেন হার না মানা ১৮১ রান। ম্যাচটি ১৯১ রানে জিতে নেয় উইন্ডিজরা। নিজেদের তৃতীয় ম্যাচে এসে উইন্ডিজদের বিপক্ষে শেষ বলে জয় ছিনিয়ে নেয় পাকিস্তান। ১ উইকেটের জয়ে অনেকটাই নিশ্চিত হয়ে যায় পাকিস্তানের সেমিফাইনাল। চতুর্থ ম্যাচে রমিজ রাজার সেঞ্চুরির কল্যাণে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সহজেই ৭ উইকেটের জয় পায় স্বাগতিক পাকিস্তান। গ্রুপ সেরা হয়ে সেমিতে ওঠে যায় তারা। অন্যদিকে, শেষ পর্যন্ত ওয়েস্ট ইন্ডিজকে টপকে বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে জায়গা করে নেয় ইংল্যান্ড।  

সেমিফাইনালে প্রথম ম্যাচে লাহোরে সমর্থকদের একদম হতাশ করে পাকিস্তান। ডেভিড বুনের সর্বোচ্চ ৬৫ এর সাথে টপ অর্ডারদের ছোট পুঁজিতে ২৬৭ রানের লড়াকু পুঁজি পায় অস্ট্রেলিয়া। বোলিংয়ে ইমরান খান নেন ৩৬ রানে ৩ উইকেট। জবাবে ব্যাট হাতে ভালোই জবাব দিচ্ছিল তারা। তৃতীয় উইকেট জুটিতে ইমরান ও মিয়াদাদ ১১২ রানের জুটি গড়লেও তারা আউট হওয়ার পর পাকিস্তানের ব্যাটিং লাইনআপে ধস নামে। ১৮ রানের পরাজয়ে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নেয় স্বাগতিকরা। অস্ট্রেলিয়ার এই অসাধারণ জয়ে অবদান রাখেন ম্যাকডারমট। ৪৪ রানে ৫ উইকেট নেন এই পেসার। 

দ্বিতীয় সেমিফাইনালেও আরেক স্বাগতিক দেশ ভারত ইংল্যান্ডের বিপক্ষে মুম্বাইতে পরাজয় বরণ করে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নেয়। প্রথমে ব্যাট করে গ্রাহাম গুচের ১১৫ রানের সুবাদে ২৫৪ রানের সংগ্রহ পায় তারা। জবাবে ব্যাট করতে নেমে আজহারউদ্দিনের ৬৪ রান ছাড়া আর কোন ভারতীয় ব্যাটসম্যানই বলার মত রান করতে পারেননি। ২৭ বল বাকি থাকতে ২১৯ রানে অলআউট হয়ে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নেয় ভারত। 

স্বাগতিক দুই দলের বিদায়ে বিশ্বকাপটা কার্যত পরিণত হয় ইংল্যান্ড-অস্ট্রেলিয়ার মর্যাদা লড়াইয়ের ম্যাচে। দুটি দলই এর আগে একবার করে ফাইনাল খেলে পরাজয়ের স্বাদ নিয়েছে। আর এবার তারা প্রথমবারের মত বিশ্বকাপ লড়াইয়ের জন্য একে অপরের মুখোমুখি। হয়তো অনেকেই ভেবেছিল তাদের ম্যাচ দেখতে অনেক কম মানুষ উপস্থিত থাকবে সেদিন। কিন্তু কলকাতার ইডেন গার্ডেনে ৯৫ হাজার মানুষ উপভোগ করে অস্ট্রেলিয়ার উত্থানের গল্প। 

লর্ডসের বাইরে হওয়া প্রথমবারের মত কোন বিশ্বকাপের ফাইনালে নিজেদের রূপকথার গল্প লেখে তরুণ অস্ট্রেলিয়ান দল। ডেভিড বুনের ৭৫ রানের সুবাদে ভালো সূচনা পায় অজিরা। শেষ দিকে এলান বোর্ডার ও মাইক ভেলেত্তার ৭৫ রানের জুটিতে ৫০ ওভারে ৫ উইকেট হারিয়ে ২৫৩ রানের লড়াকু সংগ্রহ পায় তারা। 

জবাবে এথলির ৫৮ রান ও লামবের ৪৫ রান ছাড়া তেমন কেউই বড় স্কোর করতে পারেননি। স্লগ ওভারে অস্ট্রেলিয়ান বোলারদের দুর্দান্ত বোলিংয়ের পাশাপাশি তরুণ স্টিভ ওয়াহও দুর্দান্ত বোলিং করেন। শেষ দুই ওভারে ইংল্যান্ডের জয়ের জন্য দরকার ছিল ১৯ রান। ৪৯ তম ওভারে বোলিং করতে এসে অসাধারণ এক ওভার উপহার দেন স্টিভ ওয়াহ। দে-ফ্রাইতাসের উইকেট নেওয়ার পাশাপাশি দেন মাত্র দুই রান। শেষ ওভারে ইংল্যান্ডের দরকার ছিল ১৭ রান। ম্যাকডারমট ১০ রান দিলে ৭ রানের অবিস্মরণীয় জয় পায় অস্ট্রেলিয়া।  

এক নজরে ১৯৮৭ বিশ্বকাপ:

সেমিফাইনালঃ ভারত, পাকিস্তান, ইংল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়া
চ্যাম্পিয়নঃ অস্ট্রেলিয়া
রানার্সআপ- ইংল্যান্ড

ফাইনাল স্কোরকার্ডঃ 

অস্ট্রেলিয়াঃ ২৫৩/৫, ৫০ ওভার।
ডেভিড বুন ৭৫। হেমিংস ২/৪৮
ইংল্যান্ডঃ  ২৪৬/৮, ৫০ ওভার। 
বিল এথে ৫৮। স্টিভ ওয়াহ ২/৩৭ 

ফলাফলঃ অস্ট্রেলিয়া ৭ রানে জয়ী

টুর্নামেন্টের কিছু উল্লেখযোগ্য পারফরম্যান্সঃ 

# বিশ্বকাপে সবচেয়ে কম রানের ব্যবধানে ভারতকে ১ রানে হারায় অস্ট্রেলিয়া। অন্যদিকে, ১ উইকেটের ব্যবধানে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে হারায় পাকিস্তান। 
# ১৮২, শ্রীলংকার বিপক্ষে ওয়েস্ট ইন্ডিজের ডেসমন হায়েন্স ও ভিভ রিচার্ডস ১৮২ রানের জুটি গড়েন যা বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ। 
# অস্ট্রেলিয়ার গ্রেগ ডায়ার ও ভারতের কিরান মোরে দুজনেই বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ ১১টি ডিসমিসাল করেন। 
#  বিশ্বকাপে ফিল্ডার হিসেবে সর্বোচ্চ ৫টি ক্যাচ নিয়েছেন কপিল দেব
# ৫/৪৪ পাকিস্তানের বিপক্ষে অস্ট্রেলিয়ার ক্রেইগ ম্যাকডারমট ৪৪ রানে ৫ উইকেট নেন। এই বিশ্বকাপে এটাই একমাত্র ৫ উইকেট পাওয়ার ঘটনা। 
# ১৮ বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ উইকেটশিকারী বোলার অস্ট্রেলিয়ার ক্রেইগ ম্যাকডারমট।  
# ৪৭১ বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ ৪৭১ রান করেন গ্রাহাম গুচ 
# ৪০,৫০০ বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়ন হয়ে ৪০ হাজার ৫০০ পাউন্ড প্রাইজমানি পায় অস্ট্রেলিয়া। 
# বিশ্বকাপে প্রথমবারের তিন ব্যাটসম্যান গ্রাহাম গুচ (৪৭১), ডেভিড বুন (৪৪৭), জিওফ মার্স (৪২৮) চারশো এর অধিক রান করেন এক বিশ্বকাপে। 

ডেইলি বাংলাদেশ/সালি