অক্সিজেন ছাড়াই পানির নিচে ঘণ্টা পার করে মৎসকন্যারা!

ঢাকা, বুধবার   ২৭ মে ২০২০,   জ্যৈষ্ঠ ১৩ ১৪২৭,   ০৩ শাওয়াল ১৪৪১

Beximco LPG Gas

অক্সিজেন ছাড়াই পানির নিচে ঘণ্টা পার করে মৎসকন্যারা!

সাতরঙ ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৪:৩১ ৬ মে ২০২০   আপডেট: ১৪:৪৬ ৬ মে ২০২০

ছবি: জাপানের মৎসকন্যারা

ছবি: জাপানের মৎসকন্যারা

সাদা পোশাক পরা, ছিমছাম শরীরের নারীরা চোখের পলকে সমুদ্রের গভীরে ডুব দেয়। গভীর সমুদ্রের তলদেশ থেকে তার কুড়িয়ে আনে মাছ, মুক্তা ও শৈবাল। ঘণ্টার পর ঘণ্টা তারা অক্সিজেন ছাড়াই পানির নিচে থাকতে পারে। ডুব দেয়া ও দম ধরে রাখার বিষয়ে তাদের রয়েছে পারদর্শীতা।

আমা জাপানি ডাইভারস। যারা মুক্তা সংগ্রহের জন্য বিখ্যাত। এরা উমিনচু (ওকিনাওয়ানে) বা কাইটো (ইজু উপদ্বীপ) নামেও পরিচিত। জাপানের হাজার বছরের পুরনো ঐতিহ্য এটি। হিয়ান আমলে ৯২৭ খ্রিস্টাব্দের প্রথম দিকে এটি শুরু হয়। 

দম ধরে রাখতে পারদর্শী তারাপ্রথম দিকের আমারা সামুদ্রিক খাবারের জন্যই শুধু গভীর জলে ডুব দিত। এরপর অবশ্য সামুদ্রিক খাবার ছাড়াও শৈবাল, মুক্তা সংগ্রহ করা তাদের পেশা হয়ে ওঠ। এটি মূলত নারীরাই করে থাকে। তারা এই কাজ মা এবং দাদীদের কাজ থেকেই শিখেছে। এদের বলা হয়, আমা ড্রাইভার। তারা সাধারণত সমুদ্রের তলদেশ থেকে সামুদ্রিক শৈবাল, খাবার, মুক্তা সংগ্রহ করে। সাদা রংয়ের কটিযুক্ত একটি পোশাক পরেই তারা সমুদ্রে ঘুরে বেড়ায়। 

তবে বিংশ শতাব্দীতে এসে তাদের পোশাকে ভিন্ন ভিন্ন মাত্রা যোগ হয়েছে। এটি শুরু হয়েছিল প্রায় তিন হাজার বছর আগে। তবে শুরু হওয়ার কিছু শতাব্দী পরেই এ কাজ বন্ধ হয়ে যায়। পরে ১৮৯৩ সালে মিকিমোটো কাকিচি আবার এভাবে মুক্তা সংগ্রহ শুরু করেন। এরপর সবাই এই পদ্ধতির সঙ্গে পরিচিত হতে থাকে। 

দল বেধে সমুদ্রে নেমেছেন আমারামিকিমোটো কাকিচি একটি দল গঠন করেন এবং প্রশিক্ষণ দেন। তিনি টোবার মিকিমোটো পার্ল দ্বীপটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। যা আজ আন্তর্জাতিক বিশ্বে পার্লের চাহিদা মেটাতে পারছে। এছাড়াও পর্যটকদের একটি আকর্ষণীয় স্থানে পরিণত হয়েছে এই দ্বীপটি। সারাবছরই আমা ডাইভিং দেখতে ভিড় করেন দেশি বিদেশি অনেক পর্যটক।

কেউ কেউ ক্যামেরাবন্দী করেন এদের দুঃসাহসিক কাজ। ১৯৪০-এর দশকে জাপানের উপকূলে নারীদের কাছে এটি বেশ জনপ্রিয় পেশা হয়ে দাঁড়ায়। যা এই প্রজন্মেও নারীরা ধরে রেখেছে। এই আধুনিক যুগে এসেও এসব নারীরা এয়ার ট্যাঙ্ক ছাড়াই সমুদ্রে ডুব দেয়। জাপানে মেয়েদের ১২ থেকে ১৩ বছর হলেই প্রবীণ আমারা তাদের প্রশিক্ষণ দিতে শুরু করেন।

ছোট বেলা থেকেই তারা প্রশিক্ষণ নেয়প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তৈরি করেন আমা। এরপর তারা ডাইভিং শুরু করে। কথিত আছে, ৭০ এর দশকের আমারা সবচেয়ে বেশি ডুব দিতে পারদর্শী ছিলেন। দীর্ঘকাল বেঁচে থাকার রহস্য হিসেবে তারা তাদের ডাইভিং প্রশিক্ষণ এবং শৃঙ্খলাকেই বিবেচনা করে থাকেন। তারা দম ধরে রাখা ও ওজন কমানোর ক্ষমতার উপর পারর্শীতা অর্জন করেন।

এমনকি তীব্র ঠাণ্ডার সময়ও তারা সমুদ্রের তলদেশে ডাইভিংয়ের জন্য চলে যায়। ডাইভিংয়ের নির্দিষ্ট মৌসুম রয়েছে। সেসময় একজন আমা তার ওজন কমিয়ে ফেলে। এতে ডাইভিংয়ের সুবিধা হয়। মিটাসুউই ওকানো নামের একজন আমা বলেন, তিনি প্রতিদিন ভোর পাঁচটায় ঘুম থেকে উঠেন। 

সমুদ্রের নিচ থেকে এভাবেই মুক্তা সংরক্ষণ করেন তারাএরপর ঘরের কাজ শেষ করে সাতটা থেকে সাতটা বিশের মধ্যে সমুদ্রের কাছে তার কাজের জায়গায় পৌঁছে যান।সেখানে তার অন্য আমা বন্ধুরা আগে থেকেই তার জন্য অপেক্ষা করে। তারা এক সঙ্গে সমুদ্রে ডুব দেয়। এক থেকে দেড় ঘণ্টার মধ্যেই আবার তারা ফিরে আসে। সামুদ্রিক শৈবাল, মাছ, শসা সংগ্রহ করেন।

মিটাসুউই আরো বলেন, এটি তাদের জীবনের একটি অংশ হয়ে গিয়েছে। যতদিন বেঁচে আছেন ততদিন এই কাজ করে যেতে চান। আধুনিক এই যুগে এসে অনেকেই এ কাজে আগ্রহী নন। এতে আমার সংখ্যা হ্রাস পাচ্ছে। আমা সংখ্যা এত মারাত্মকভাবে হ্রাস পেয়েছে যে এখন অনুশীলনকারীদের সংখ্যা দুই হাজারেরও কম। যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ের চেয়ে আট হাজার কম। 

দল বেধে বাড়ি ফিরছেন তারাআমা কেন্দ্রস্থল হিসেবে পরিচিত অগো বেতে। সেখানে এখন মাত্র ২৫ জন আমা রয়েছে। অন্যান্য দ্বীপগুলোতে এর সংখ্যা আরো কম। এভাবে চলতে থাকলে বা এখনই পদক্ষেপ না নিলে এক সময় তিন হাজারেরও বেশি পুরনো এই ঐতিহ্য হারাতে বেশি সময় লাগবে না। আমা হ্রাস পাওয়ার অনেক কারণ রয়েছে এর মধ্যে অন্যতম পারিশ্রমিক। 

এখন আগের মতো সিফুড পাওয়া যায় না। এর কারণ সমুদ্রের দূষণ। এছাড়াও এগুলো থেকে তারা পর্যপ্ত লাভ করতে পারেন না। ফলে অর্থনৈতিক সমস্যা দেখা দেয়। এজন্য তারা জাপানের বিভিন্ন শহরে পাড়ি জমাচ্ছেন চাকরির আশায়। অনেকে মাছ ধরাকে পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন। 

সূত্র: বিবিসিট্রাভেলস

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএমএস